গুরুর ছায়া ছেড়ে নিজের পথে ভ্যান্স, লক্ষ্য হোয়াইট হাউস!
- নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর নতুন রাজনৈতিক কৌশলে ভাইস প্রেসিডেন্ট
- ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন সুর

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি- রয়টার্স
ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত সহযোগীদের একজন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন তিনি। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও নীতির পক্ষে সরব অনেকটা ট্রাম্পের ছায়াতেই গড়ে উঠেছিল তার রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু সেই ট্রাম্পের ছায়া থেকেই এবার বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন ভ্যান্স। লক্ষ্য ২০২৮ সালের হোয়াইট হাউস।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর তার বক্তব্যে এসেছে নতুন সুর। ইরান যুদ্ধকে দলের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আনছেন তিনি। অথচ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভ্যান্স কি ধীরে ধীরে গুরুর ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছেন?
ভ্যান্স এখনো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় তার রাজনৈতিক অবস্থানও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়নের দৌড়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছেন তিনি।
ট্রাম্পের ছায়া থেকে আলাদা পরিচয়ের চেষ্টা
ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের সময় থেকেই তার পাশে ছিলেন ভ্যান্স। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলনের সমর্থকদের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় স্বার্থ এবং কঠোর সীমান্তনীতির পক্ষে তার অবস্থান ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে মেলে।
কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে ভ্যান্সের বক্তব্যে দেখা গেছে কিছু পরিবর্তন। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রশংসা কিংবা প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পররাষ্ট্রনীতিতে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে ভ্যান্স নিজের রাজনৈতিক বার্তাকে আলাদা করে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তার উপদেষ্টারাও মনে করেন, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও সংযত পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে ভ্যান্সের রয়েছে নিজস্ব অবস্থান।
এটি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রচারের প্রস্তুতি কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার আলোচনায় তার নাম যে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা স্পষ্ট।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে ভিন্ন সুর
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের বক্তব্য জন্ম দিয়েছে নতুন আলোচনার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। পরাজয়ের কারণ নিয়ে সৎ আলোচনা করতে হলে এই বিষয়টি সামনে আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভ্যান্স আহ্বান জানিয়েছেন দ্রুত সংঘাত শেষ করার। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এখানেই ট্রাম্পের সঙ্গে তার অবস্থানের পার্থক্য সামনে আসে। কারণ ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট এখনো সেই সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করেন। তার মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে প্রভাব পড়েছে নির্বাচনে। তবে এতে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, এমনটা তিনি স্বীকার করেননি।
ভ্যান্সের বক্তব্যকে অবশ্য ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ বলা যাচ্ছে না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন। ফলে এটি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো প্রকাশ্য পদক্ষেপ ছিল না।
তবে রাজনৈতিক বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যান্স বুঝতে পারছেন, যুদ্ধ ও অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষকে উপেক্ষা করলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে তার নিজের সম্ভাবনাও হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত।
রিপাবলিকানদের মধ্যে ভ্যান্স কতটা জনপ্রিয়?
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়নের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ভ্যান্সের অবস্থান শক্তিশালী। বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউগভের এক জরিপে সম্ভাব্য রিপাবলিকান ভোটারদের ৪৪ শতাংশ তাকে সমর্থন করেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার সমর্থন ২১ শতাংশ।
জরিপটি ২৫ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯৯ জন সম্ভাব্য ভোটারের মধ্যে পরিচালিত হয়। ফেব্রুয়ারির জরিপে ভ্যান্সের সমর্থন ছিল ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ তার সমর্থন কিছুটা কমেছে। তারপরও প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
এই সমর্থনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মাগা সমর্থকদের কাছে ভ্যান্স পরিচিত মুখ। ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে তার অবস্থানের মিলও রয়েছে।
তবে দলের সব অংশে তার সমর্থন সমান নয়। মার্কো রুবিও, ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস এবং টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজের মতো নেতারাও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন আলোচনায়। ফলে ভ্যান্সকে দলের ভেতরে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
নির্বাচনী পরাজয়ের দায় নিয়ে দলের ভেতর বিতর্ক
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ নিয়ে দলটির নেতাদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে মতভেদ। কেউ মনে করছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। আবার কেউ মনে করছেন, প্রচারে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে দেওয়া হয়েছে বেশি মনোযোগ।
এই বিতর্ক ভ্যান্সের জন্য তৈরি করেছে সুযোগ। তিনি ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি সামনে এনে ভোটারদের অসন্তোষের সঙ্গে নিজের বক্তব্যের যোগসূত্র তৈরি করতে চাইছেন।
তবে তার নিজের নির্বাচনী প্রচার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেসব এলাকায় তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানকার কয়েকটিতে দল পরাজিত হয়েছে। ফলে তার প্রচার কৌশল কতটা কার্যকর, তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা।
২০২৮ সালের পথে বড় পরীক্ষা
ভ্যান্স এখনো প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার ঘোষণা দেননি। ট্রাম্পও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে সমর্থন করেননি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় তার অবস্থান বেশ শক্ত।
তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুই ধরনের ভোটারের আস্থা ধরে রাখা। রিপাবলিকান প্রাইমারিতে এগোতে হলে ট্রাম্পের সমর্থকদের পাশে প্রয়োজন। আবার জাতীয় নির্বাচনে জিততে হলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে নিজের অবস্থান কিছুটা আলাদা করে তুলে ধরতে হবে।
ডেমোক্রাটদের জন্যও ভ্যান্সকে আক্রমণ করার সুযোগ থাকবে। কারণ তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইরান যুদ্ধ, অর্থনীতি কিংবা অভিবাসননীতি নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় এড়ানো তার পক্ষে সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে ভ্যান্স এখন এক কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখে। ট্রাম্পের সমর্থন ধরে রাখতে হবে, আবার নিজের নেতৃত্বের দাবিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গুরুর ছায়া ছেড়ে তিনি কতটা দূর যেতে পারবেন, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে ২০২৮ সালের হোয়াইট হাউসের পথে তার সম্ভাবনা।



