ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ যেন ৯/১১ পরবর্তী চিরস্থায়ী যুদ্ধের প্রতিচ্ছবি

ইরানের তেহরানের একটি ভবনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড। ছবি : রয়টার্স
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে তুলে ধরেছিলেন শান্তির প্রেসিডেন্ট হিসেবে। বলেছিলেন, বন্ধ করবেন বিদেশে চলা যুদ্ধ, শুরু করবেন না আর নতুন কোনো সংঘাত।
কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে বড় ফারাক। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধই হয়ে উঠেছে তার জন্য নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ভবনে হামলার ২৫ বছর পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ও অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে জড়ানোর পুরোনো প্রবণতার কথা।
ট্রাম্পেরও কিছু সমর্থক রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক ডুবোভিটজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সীমাহীন যুদ্ধে জড়াননি ট্রাম্প। তার দাবি, ট্রাম্প সাফল্য পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে বিজয় আসবে।
ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনা তুসি বলেছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনে যে সতর্কতা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প তা ভেঙেছেন।
‘এর ফলে তার উত্তরসূরিকে দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের উত্তরাধিকার বহন করতে হতে পারে’, যোগ করেন সিনা তুসি।
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ ৯/১১ পরবর্তী ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো নয়।
ওই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে দিয়েছিল দেশগুলোর শত্রুভাবাপন্ন সরকারকে। হাজারো স্থলসেনা মোতায়েন করে দখল ও নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ভূখণ্ড। হতাহতের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি।
ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মূলত নির্ভর করছে বিমান ও নৌ শক্তির ওপর। এসব অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তবে পরাজিত করা যায়নি দেশটিকে। ট্রাম্প শুরুতে আশা করেছিলেন, ইরানিরা তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, ঘটেনি সেটিও।
ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন আটকে আছে এক ধরনের চোরাবালিতে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ছড়িয়ে পড়ছে নতুন করে সংঘাতও। চলতি সপ্তাহে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা ও পাল্টা হামলা তারই উদাহরণ।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও চলতে পারে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের বিরোধিতা করা ভোটারদের অবস্থান প্রভাবিত করতে পারে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে।
ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে পেট্রোলের দাম। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল হয়েছে ওয়াশিংটনের অবস্থান।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও এমন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস একমাত্র ছিল ট্রাম্পেরই।
তার দাবি, নিজের সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন ট্রাম্প। বাড়তি নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধে বিপর্যস্ত হচ্ছে ইরানের অর্থনীতি।
তবে ইরান যুদ্ধকে ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন যুদ্ধগুলোর সঙ্গে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সে প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি আনা কেলি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প উপেক্ষা করেছেন ৯/১১ পরবর্তী যুগের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়েদার সদস্যরা বিমান হামলা চালায় নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটনের কাছে পেন্টাগনে। এতে নিহত হন প্রায় ৩ হাজার মানুষ।
এর পর শুরু হয় দীর্ঘ কয়েক দশকের সংঘাত। প্রথমে আফগানিস্তানে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালানো হয়। দেশটির কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, ভুল প্রমাণিত হওয়া এমন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল ওই যুদ্ধ।
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের এই দুই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বড় চাপ তৈরি করে। একই সঙ্গে অস্থিতিশীলতা বাড়ে মধ্যপ্রাচ্যে।
মিরাকল হলো, এই যুদ্ধগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হওয়া ক্ষোভই এক দশক আগে ভূমিকা রেখেছিল ট্রাম্পের উত্থানে। আর ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি আমেরিকানদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সামরিক সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা ভুলভাবে হিসাব করেছেন ইরানের সক্ষমতা। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথও আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করে ইরানে। সমালোচকরা বলছেন, এটি ৯/১১ এর মতো কোনো জাতীয় ট্র্যাজেডির প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয়নি। বরং ইরানের বিরুদ্ধে এটি ছিল ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ।
ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন আটকে আছে এক ধরনের চোরাবালিতে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ছড়িয়ে পড়ছে নতুন করে সংঘাতও। চলতি সপ্তাহে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা ও পাল্টা হামলা তারই উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই দাবিরও করেছেন সমালোচনা। তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল, ট্রাম্পের এই দাবি নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইরান হয়তো শিক্ষা নিচ্ছে আফগানিস্তানে তালেবানের অভিজ্ঞতা থেকে। পাঁচ বছর আগে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে চলে গেলে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে তালেবান।
এই বাস্তবতা এটাই বলছে, কোনো পক্ষ দৃঢ়ভাবে লড়াই করলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি সময় লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে চাপ বাড়লে কমে যেতে পারে দেশটির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রদের সীমিত সমর্থন। অথচ ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল বুশ প্রশাসন। যদিও পরে সময়ের সঙ্গে কমে যায় সেই সমর্থন।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। ইরানে হামলার আগে তিনি মিত্রদের সঙ্গে খুব কম পরামর্শ করেছেন। যুদ্ধের কারণও ব্যাখ্যা করেননি বিস্তারিতভাবে। ইউরোপ ও এশিয়ার নেতারাও তার আহ্বানে সাড়া দেননি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন, ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ কমানো এবং বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে মিত্রদের সম্পর্ক এমনিতেই চাপের মধ্যে ছিল।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও। ইরাক যুদ্ধের মতোই এ ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক উত্তেজনা। তবে ওয়াশিংটন যেন এর মাত্রা আগে থেকে বুঝতে পারেনি।
ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্য হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররাও। ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো এখন এই যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। কারণ, তারা এই যুদ্ধ চায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, ‘এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কী ছিল?’
সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কারণে চলা এসব যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছে।
সেসময় ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে শুরুতে এই যুদ্ধের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী জনসমর্থন ছিল। ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সেই সুযোগও পায়নি।
শুরু থেকেই অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি তার আমেরিকা ফার্স্ট নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ও অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে জড়ানোর পুরোনো প্রবণতার কথা।
ট্রাম্প শুরুতে ৩ জানুয়ারির অভিযানের মতো আশা করেছিলেন দ্রুত জয় পাওয়ার। ওই অভিযানে আটক করা হয়েছিল ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে।
কিন্তু ইরানে অভিযান শেষ পর্যন্ত এখন পড়েছে অচলাবস্থায়। এখানে পূরণ হয়নি ট্রাম্পের বেশিরভাগ লক্ষ্যই। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার লক্ষ্যও রয়েছে। একই সঙ্গে কমে গেছে পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও।
তবে ট্রাম্পেরও কিছু সমর্থক রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের প্রধান মার্ক ডুবোভিটজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সীমাহীন যুদ্ধে জড়াননি ট্রাম্প।
তার দাবি, ট্রাম্প সাফল্য পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে বিজয় আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
ডুবোভিটজ বলছিলেন, ‘৪৭ বছর ধরে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছে ইরান। এখন আমরা করেছি পাল্টা আঘাত।’
সূত্র : রয়টার্স








