চটেছেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় সখ্য হুমকির মুখে
- ভেঙে যেতে পারে ৭৭ বছরের ন্যাটো জোট
- গণতন্ত্র ও আইনের শাসন রক্ষার্থে ইইউর মিত্র হওয়ার আশা কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রীর
- কানাডাকে ইইউর সদস্য করার প্রস্তাব উসকানিমূলক: ট্রাম্প

ন্যাটো ও কানাডাকে ঘিরে ইউরোপের সঙ্গে শীতল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটোর ওপর ট্রাম্পের চাপ ইউরোপের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেঙে যেতে পারে ৩২টি দেশের ৭৭ বছরের পুরনো নিরাপত্তা জোট ন্যাটো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক হোঁচট খেতে পারে। এরই মধ্যে ইইউ কানাডাকে তাদের ‘সহযোগী সদস্য’ করার ঘোষণায় বেজায় খেপেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যাকে তিনি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উসকানিমূলক তৎপরতা/বৈরী পদক্ষেপ। বুধবার রাতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইউরোপের এমন পদক্ষেপ কার্যকর হলে আমি ইউরোপের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করব অথবা অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেব। অত্যন্ত ভারী শুল্ক আরোপ করব। কানাডাকে বাজে বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেও অভিহিত করেছেন।
ন্যাটোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সংঘাতের ফলে ইউরোপের মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের ওপর কম নির্ভরশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান অন্তত জটিল। তিনি মনে করেন, সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার সুবিধা বিনা খরচে ভোগ করছে। ৩২ দেশের এই জোটের সঙ্গে ট্রাম্পের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আপাত বৈপরীত্য। তিনি সেনাসংখ্যা কমানোর হুমকি দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে ইউরোপীয় সরকারগুলোর নিঃশর্ত সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন ট্রাম্প। এতে তিনি ইউরোপীয় সরকারগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন।
ন্যাটোর ওপর ট্রাম্পের চাপের প্রভাব যাচাই করতে রয়টার্স ৫০ জনেরও বেশি বর্তমান ও সাবেক পশ্চিমা কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কংগ্রেসের সহযোগী এবং ন্যাটোর কাছে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূতরাও রয়েছেন। এ ছাড়া রয়টার্সের সাংবাদিকরা রোমানিয়া ও এস্তোনিয়ায় ন্যাটোর ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং নর্থ ক্যারোলিনা উপকূলে ন্যাটোর সামরিক মহড়াও পর্যবেক্ষণ করেছেন।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই জোটটি চাপের মুখে থাকলেও এখনো ভেঙে পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের নয়জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং ইউরোপে বড় গ্রাহক রয়েছে এমন প্রভাবশালী মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের হাতে ন্যাটোর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে— যে পদক্ষেপটি নেওয়ার হুমকি ট্রাম্প বারবার দিয়ে আসছেন।
তবে ট্রাম্পের এসব আক্রমণ ৭৭ বছরের পুরনো এই জোটের এমন ক্ষতি করছে, যা পূরণ করা কঠিন বলে মনে করছেন ইউরোপীয় ও মার্কিন কৌশলবিদরা। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইউরোপ ক্রমশ প্রশ্ন তুলছে; আর এই সংশয় এখন পুরো মহাদেশ জুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয়, অস্ত্র কেনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলছে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন, যা ন্যাটোর প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই ব্যবস্থাটি হলো ‘অনুচ্ছেদ ৫’। যার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে , কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা জোটের সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। নির্ভরযোগ্যতাহীন/ফ্লিপফল্প যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর ব্যর্থতা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। বিশেষ করে যখন এই অঞ্চলটি তার পূর্ব সীমান্তে আক্রমণাত্মক ও প্রকাশ্য সম্প্রসারণবাদী রাশিয়ার হুমকির মুখে রয়েছে।
এ ছাড়া ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কানাডা, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও স্পেনসহ অন্তত আটটি সদস্য দেশ মার্কিন অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থব্যয়ে বাধ্য করার জন্য ট্রাম্পের যে প্রচেষ্টা, তা শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে; কারণ এর ফলে কিছু মিত্রদেশ মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও সামরিক প্রযুক্তির ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনার পথে হাঁটতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন কানাডার জন্য ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার পথ উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের বিরূপ মন্তব্য এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির মুখে অটোয়া যখন ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তখনই ইউরোপের প্রস্তাবটি সামনে এলো। ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় কানাডাবাসীরা যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের কাছে কানাডাকে তুলে ধরছেন।
কানাডা ও ইইউ ইতিমধ্যেই বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করছে। আগামী মাসে মন্ট্রিলে অনুষ্ঠিতব্য কানাডা-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার আশা করা হচ্ছে।
এদিকে কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইইউ সদস্য হওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনশাসিত বিশ্বে নিজেদের বাজার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন রক্ষার স্বার্থে কানাডা ও ইউরোপের উচিত একে অপরের মিত্র হওয়া। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণের জন্য কানাডার প্রধানমন্ত্রী উষ্ণ করতালির মাধ্যমে অভিনন্দিত হন। ইইউ-কানাডা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মর্যাদা বা অবস্থান তৈরির বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েনের প্রস্তাবের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছিলেন, তার কয়েক ঘণ্টা পরেই কার্নি এই ভাষণটি দিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা, এপি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস



