৪ মার্কিন নাগরিক হত্যা
৩০ বছর পর বিচারের মুখে কিউবার রাউল কাস্ত্রো

রাউল কাস্ত্রো। ছবি: সংগৃহীত
প্রায় তিন দশক আগের বহুল আলোচিত বিমান ভূপাতিতের ঘটনায় কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার প্রকাশিত এই অভিযোগকে ওয়াশিংটন ও হাভানার সম্পর্কের নতুন উত্তেজনাপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দাবি, ১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মিয়ামিভিত্তিক কিউবান নির্বাসিত ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামে উদ্ধারকারী সংগঠনের দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার সিদ্ধান্তে সে সময়ের কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রো সরাসরি জড়িত ছিলেন। এই ঘটনায় চারজন মার্কিন নাগরিক নিহত হন।
রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে একজন মার্কিন নাগরিককে হত্যার ষড়যন্ত্র, চারটি হত্যা এবং বিমান ধ্বংসের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় আরও পাঁচজনসহ অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহত চারজন হলেন কার্লোস কস্তা, আর্মান্ডো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, মারিও দে লা পেনা এবং পাবলো মোরালেস।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ছিলেন নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তি। তারা সমুদ্রে ভাসমান কিউবান শরণার্থীদের উদ্ধার ও সহায়তার মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন।
মিয়ামির ঐতিহাসিক ফ্রিডম টাওয়ারে অভিযোগ ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ। তিনি বলেছেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে। আজকের বার্তা স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের কখনো ভুলে যায় না।
তিনি আরও বলেছেন, কেউ আমেরিকানদের হত্যা করলে, সে যত ক্ষমতাবানই হোক বা যত সময়ই পেরিয়ে যাক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলও এই অভিযোগকে জবাবদিহিতার পথে বড় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন।
কী ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে?
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ সংগঠনটি মূলত সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়া কিউবান শরণার্থীদের খুঁজে বের করে সহায়তা দিত। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিউবান নির্বাসিত হোসে বাসুলতো।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংগঠনটির দুটি ছোট বিমান ফ্লোরিডা প্রণালীর আকাশে গুলি করে ভূপাতিত করে কিউবার যুদ্ধবিমান। এ ঘটনায় চারজন নিহত হন।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক তদন্তকারীরা দাবি করেন, বিমান দুটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ছিল। তবে কিউবার পক্ষ থেকে বলা হয়, বিমানগুলো তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল বা তার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।
তৎকালীন কিউবান নেতা ফিদেল কাস্ত্রো পরে অস্বীকার করেন যে তিনি বা রাউল কাস্ত্রো সরাসরি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিউবার প্রতিক্রিয়া
অভিযোগ প্রকাশের পর কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল একে “রাজনৈতিক নাটক” বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৬ সালের ঘটনাকে “মিথ্যা ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন” করছে, যাতে কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পরিবেশ তৈরি করা যায়।
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজও হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কিউবার জনগণের প্রতি “অপমানজনক” এবং “নব্য-ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন”।
উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস দে কসিও অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ ফ্লোরিডার কিউবান নির্বাসিত ভোটারদের খুশি করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
কেন এখন এই মামলা?
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ শুধু পুরোনো ঘটনার বিচার নয়; বরং কিউবার ওপর নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির অংশ।
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের অধ্যাপক অরল্যান্ডো পেরেজ বলেছেন, ওয়াশিংটন একদিকে কিউবার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে চাপ বাড়াচ্ছে। রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই কৌশলেরই অংশ।
তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপ উল্টো কিউবার কট্টরপন্থী অংশকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কারণ এখনো দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় রাউল কাস্ত্রোকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক হিসাব?
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই মামলার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।
দক্ষিণ ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকান ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের কড়া সমালোচক এবং রিপাবলিকানদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। ফলে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই মামলা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য লাভজনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উইলিয়াম লিওগ্রান্ডে বলেছেন, এটি মূলত দক্ষিণ ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকানদের জন্য ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওর রাজনৈতিক বার্তা।
সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে অতিরিক্ত চাপ বা সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক লি শ্লেঙ্কার বলেছেন, অধিকাংশ আমেরিকানই কিউবার বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধ চায় না। সামরিক অভিযান বা কঠোর নিষেধাজ্ঞা বড় মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
তার মতে, এতে নতুন অভিবাসন সংকটও তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই রাজনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রায় ৩০ বছর পর রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আবারও সামনে নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়কে। এখন দেখার বিষয়, এই মামলা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার নতুন পথ খুলে দেয়।




