চাঁদের অন্ধকার পিঠ থেকে বিষণ্ন বানর, আলোচনায় যেসব ছবি

সংগৃহীত ছবি
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বেশ কিছু অসাধারণ ও হাড়হিম করা ছবি। এই ছবিগুলো স্রেফ সুন্দর দৃশ্যই নয়, বরং এদের গভীরতা আর নাটকীয়তা শিল্প ইতিহাসের বিশ্বখ্যাত সব বড় বড় চিত্রকর্মের কথা মনে করিয়ে দেয়। চলুন, দেখে নেওয়া যাক এই বছরের এ পর্যন্ত তোলা সবচেয়ে ৯টি দুর্দান্ত আলোকচিত্রের গল্প।
১. প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসের গ্রেফতার
গত জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলার একসময়ের প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের গ্রেফতার হওয়ার এক অবিশ্বাস্য ছবি সারা দুনিয়ায় মস্ত বড় শোরগোল ফেলে দেয়। সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টদের পাহারায় হাতকড়া পরা অবস্থায় কুঁজো হয়ে হেঁটে যাওয়া এই ক্ষমতাধর জুটির ছবিটির ভেতর এক বিশাল নাটকীয়তা লুকিয়ে ছিল। এক নিমেষে চিরচেনা রাজকীয় ক্ষমতা হারিয়ে সাধারণ কয়েদীতে রূপ নেওয়ার এই করুণ দৃশ্য চিত্রশিল্পীদের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে আসছে। রোকোকো যুগের বিখ্যাত শিল্পী টাইপোলো (যিনি রানী জেনোবিয়ার বন্দি হওয়ার দৃশ্য এঁকেছিলেন) থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়ান পেইন্টার চার্লস ইস্টলেক—যিনি নেপোলিয়নকে জাহাজে বন্দি অবস্থায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকার রূপে ফুটিয়ে তুলেছিলেন—সবার ক্যানভাসের সাথেই এই ছবির এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
২. বাগুরুম্বা নৃত্যশিল্পী
গত জানুয়ারি মাসে ভারতের আসামের গুয়াহাটির সরুসজাই স্টেডিয়ামে বোড়ো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রজাপতি নৃত্য বা বাগরুম্বা নাচের এক বিশাল আয়োজন সম্পন্ন হয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখানোর এই মহড়ায় ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাকে শত শত নৃত্যশিল্পীর ওপর থেকে নেওয়া এক ড্রোন শট বা এরিয়াল ভিউ সবাইকে পুরোপুরি তাক লাগিয়ে দেয়। উপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন হাজারো রঙ মিলেমিশে এক জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। তালের ছন্দে ছন্দে চমৎকার এই রঙের খেলা বিখ্যাত বিমূর্ত চিত্রশিল্পী পিট মন্ড্রিয়ানের শেষ জীবনের সেই বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘ভিক্টরি বুগি উগি’-র কথা মনে করিয়ে দেয়, যা তিনি ১৯৪৪ সালে মৃত্যুর আগে মিউিকের সুরকে রঙে রূপ দিতে গিয়ে নিজের ক্যানভাসে আধো-অসমাপ্ত রেখে গিয়েছিলেন।
৩. ইউক্রেনীয় ড্রোন
রাশিয়ার সাথে চলমান যুদ্ধের একদম ফ্রন্টলাইনে গত জানুয়ারি মাসে ইউক্রেনের এক সেনাসদস্যের খালি হাতে আকাশ থেকে একটি ড্রোন ধরার ছবি নেটদুনিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক নিচে শুয়ে এক চতুর ফটোসাংবাদিক এই ছবিটি তোলায় এর ভেতরের কোণ বা পারসপেক্টিভ এক মস্ত বড় চমক তৈরি করেছে। নিচে কোনো গাছপালা বা ঘরবাড়ি না থাকায় সেনাসদস্যটিকে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন এক বিশাল দানব আকাশ থেকে আস্ত এক যুদ্ধবিমান লুফে নিচ্ছেন। এই বিশালাকার মানুষের রূপটি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী গয়ার সেই গা ছমছমে ‘এল কোলোসো’ (দ্য কলোসাস) পেইন্টিংয়ের কথা মনে করায়, যা স্প্যানিশ স্বাধীনতা যুদ্ধের এক প্রতীকী রূপ হিসেবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
৪. অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের গ্রেফতার
গত ফেব্রুয়ারি মাসে নরফোকের আইলশাম থানা থেকে গ্রেফতারের পর সাবেক ব্রিটিশ রাজপুত্র অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে যখন পুলিশ গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছিল, আলোকচিত্রী ফিল নোবেল তখন তার এক ঐতিহাসিক ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের বাণিজ্য প্রতিনিধি হিসেবে নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের পর এই সাবেক রাজপুত্রের মুখের সেই হতভম্ব ও হা করা অভিব্যক্তি মানুষের মনে সারাজীবনের জন্য গেঁথে গেছে। রাজপরিবারের কোনো সুন্দর তৈলচিত্রে এমন আতঙ্কের রূপ খুঁজে পাওয়া না গেলেও স্যার চার্লস বেলের ১৮০৬ সালের বিখ্যাত বই ‘এসেইস অন দ্য অ্যানাটমি অব এক্সপ্রেশন ইন পেইন্টিং’-এ ফুটিয়ে তোলা চরম ভয়ের সেই চেনা স্কেচের সাথে এর হুবহু মিল পাওয়া যায়।
৫. একলা বানর পাঞ্চ
গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাপানের ইচিকাওয়া সিটি জু বা চিড়িয়াখানায় এক ছোট্ট জাপানি মেকাক বা বানর ছানা ‘পাঞ্চ’-এর এক বুকভাঙ্গা ছবি দর্শকদের চোখের কোণায় জল এনে দেয়। খাঁচার ভেতর একলা বসে থাকা এই অবুঝ ছানাটি তার পাশে থাকা একটি বড় পুতুল ওরাংউটানের চোখের দিকে যেভাবে পরম মমতায় আর করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল, তা এই বছরের অন্যতম এক সেরা আবেগঘন মুহূর্ত। পাঞ্চের এই না-পাওয়া ভালোবাসার তীব্র আকুলতা উনিশ শতকের শেষভাগের জার্মান চিত্রশিল্পী ও প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ গ্যাব্রিয়েল ভন ম্যাক্সের সেই বিখ্যাত ‘মাঙ্কি বিফোর স্কেলিটন’ (১৯০০) ছবির কথা মনে করায়, যেখানে একলা এক বানর কঙ্কালের দিকে এক অজানা আশায় তাকিয়ে থাকত।
৬. সিরিয়ার সেই বিড়াল
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে কুর্দি শরণার্থীরা যখন সিরিয়ার ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস ও সরকারের চুক্তির পর নিজের ভাঙা ভিটেমাটিতে ফিরে আসছিলেন, তখন এক ট্রাকে গদি আর তোশকের স্তূপের মাঝে এক বিড়ালের ছবি আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ট্রাকের গোলাপী জানালার কাঁচের ওপার থেকে বিড়ালটি যেভাবে বাইরের কোনো অচেনা জিনিসের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, তা শরণার্থীদের ঘরছাড়ার সেই আকুলতাকেই যেন মূর্ত করে তোলে। নির্বাসন আর নিজের চেনা ঘরের মাঝখানে ঝুলে থাকা এই বিড়ালের স্থির চোখের মণি দর্শকদের মনে এক অদ্ভুত নীরব কান্না তৈরি করে। এই ছবিটি ১৭ শতকের ডাচ পেইন্টার জেরার্ড ডাউ-এর সেই বিখ্যাত ‘ক্যাট অন এ লেজ’ (১৬৫৭) ছবির সেই ওত পেতে থাকা বিড়ালের জীবন্ত রূপটিকে চোখের সামনে আবারও এনে দাঁড় করায়।
৭. সিডনির পালতোলা নৌকা
গত এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবারের নর্থ হেডের সামনে এক বিশাল ও রঙিন রংধনুর একদম পেটের ভেতর এক বিলাসবহুল ইয়ট বা পালতোলা নৌকাকে ঢুকে যেতে দেখা যায়। আকাশ থেকে নেমে আসা সাতরঙা আলোর মায়াবী চাদরের সাথে মাঝ দরিয়ার সেই নৌকার প্রায় ধাক্কা লাগার এই অলৌকিক দৃশ্যটি প্রকৃতিপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে। বাস্তববাদী চিত্রশিল্পী নিকোলাই নিকানোরোভিচ ডুবোভস্কয় ১৮৯২ সালে তার এক বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিংয়ে ঠিক এমনই এক আকাশছোঁয়া আলোর মায়াজাল ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যার বাস্তব রূপ যেন এই সিডনির বুকে এসে ধরা দিয়েছে।
৮. পৃথিবী অস্ত
সূর্যাস্ত তো অনেকবার দেখেছেন, কিন্তু পৃথিবীঅস্তের দৃশ্য কি কখনও দেখেছেন? গত ৬ এপ্রিল আর্টেমিস ২ মিশন থেকে নাসার নভোচারী ক্রিস্টিনা কোক মহাশূন্যের ধূসর ও মৃত চাঁদের দিগন্তে আমাদের চেনা নীল পৃথিবীকে আস্তে আস্তে ডুবে যেতে দেখার এক মহাজাগতিক ছবি তোলেন। মহাশূন্যের এই অনন্ত ও হিমশীতল অন্ধকারের মাঝে আমাদের সাধের পৃথিবীটা যে কতটা একা এবং ভঙ্গুর, তা এই ছবিটি দেখলেই সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হায়ারোনিমাস বশ তার বিখ্যাত ‘গার্ডেন অব আর্থলি ডিলাইটস’ ট্রিপটিকের বাইরের প্যানেলে সৃষ্টির শুরুর দিকের পৃথিবীকে যেভাবে এক শূন্য খাঁচায় ভাসমান একলা গোলক হিসেবে এঁকেছিলেন, ক্রিস্টিনার তোলা এই ছবিটির রূপও যেন ঠিক তেমনই এক অপার্থিব অনুভূতি দেয়।
৯. গাজা সিটির ফুটবল মাঠ
ইসরায়েলের সাথে দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা সিটির ঠিক মাঝখানে এক টুকরো উজ্জ্বল সবুজ ফুটবল মাঠের এক এরিয়াল বা ড্রোন শট পুরো বিশ্বকে এক মস্ত বড় ধাক্কা দেয়। চারপাশে কংক্রিটের ভাঙা দালানকোঠা আর লাশের গন্ধের মাঝে এই নিখুঁত জ্যামিতিক মাঠটি যেন ধ্বংসের বুকে এক নতুন জীবনের জয়গান গাইছে। রুক্ষ ও শুষ্ক মরুভূমির মাঝে এক টুকরো সুশৃঙ্খল মরূদ্যান গড়ে তোলার প্রাচীন পারস্য বা মুঘলদের সেই ‘চাহার বাগ’ ঐতিহ্যের ছোঁয়া যেন এই ফুটবল মাঠে এসে মিলেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’-র ১৬ শতকের এক প্রাচীন লঘুচিত্রে ঠিক এমনই এক সুন্দর উদ্যানের ছবি দেখতে পাওয়া যায়।













