কীভাবে ‘শান্তির দূত’ হয়ে উঠলেন আসিম মুনির

তেহরানে বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ছবি : আনাদুলো এজেন্সি
ইরান যুদ্ধে বিশ্ব যখন টালমাটাল তখন সংঘাত থামাতে এগিয়ে এলো পাকিস্তান। আরও খোলাসা করে বলতে গেলে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির! তার বহুমুখী ‘কানেকশন’ দুই চিরশত্রু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে ছড়িয়ে গেছে সবার মুখে মুখে। এই যুদ্ধবিরতি তাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে।
তেহরানে গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান। এসময় তার ভূয়সী প্রশংসা শোনা গেছে ইরানের প্রেসিডেন্টের মুখে। অপরদিকে মুনির তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গুডবুকে’ আছেন আগে থেকেই!
বুধবার সন্ধ্যায় তেহরানে বিমান থেকে নেমেই সরাসরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও যুদ্ধবিরতির প্রধান আলোচক আব্বাস আরাঘচিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মুনির। পাকিস্তানের এই শক্তিশালী সামরিক প্রধানের গায়ে ছিল পূর্ণ সামরিক পোশাক। যেই পোশাকে চলে যুদ্ধ, সেই পোশাকেই শান্তি আলোচনার জন্য তেহরানে গিয়ে ব্যতিক্রম নজিরই স্থাপন করলেন পাকিস্তানের এই ফিল্ড মার্শাল।
এর আগে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরান পাল্টা জবাব দিলে যুদ্ধ ছড়িতে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়ে বিশ্ব।
এমন অবস্থায় যুদ্ধ থামাতে এগিয়ে আসে পাকিস্তান। ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয় যুদ্ধ। পরে গত শনিবার শান্তিচুক্তি করতে ইসলামাবাদে আলোচনায় বসে দুপক্ষ।
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা তেহরান ও ওয়াশিংটনের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদল আলোচনা করেও বের করতে পারেননি কোনো সমাধান। এতে আবার ঝুঁকিতে পড়েছে যুদ্ধবিরতি। তার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ ও ইরানি সব বন্দরে করেছেন অবরোধ।
এমন কঠিন পরিস্থিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শেষ চেষ্টা হিসেবে বুধবার রাতে তেহরানে ছুটে যান মুনির। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে নতুন করে আলোচনার জন্য একটি রূপরেখা নিয়ে ইরানে পৌঁছান তিনি। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মুনিরের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন ট্রাম্পও।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অপ্রত্যাশিতভাবেই আবির্ভূত হয় পাকিস্তান। যেখানে আসিম মুনিরকে দেখা হচ্ছে প্রধান ব্যক্তি হিসেবে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সেই অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন, যিনি সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে। একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উভয় পক্ষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। সবাই জানে যে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে নয়, বরং সেনাবাহিনীর কেন্দ্র রাওয়ালপিন্ডি থেকে নেওয়া হয় যেকোন সিদ্ধান্ত।
জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মালিহা লোধির দাবি, ফিল্ড মার্শাল মুনিরই যুদ্ধবিরতির মূল ব্যক্তি, তাকে ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।
তার ভাষ্য, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখানে কেবল ছোট অংশীদার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো আস্থা রাখে আসিম মুনিরের ওপর। ইসলামাবাদের সরকারি মন্ত্রীরা আসলে একজন সহায়ক মাত্র।
গুঞ্জন আছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য ট্রাম্প সরাসরি চাপ দেন মুনিরকে। আর শনিবার ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদলের উভয় কক্ষে একমাত্র তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান।
মার্কিন প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামাবাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গেই কাজ করতে করেন বেশি পছন্দ।
বিশ্লেষকদের জোর দাবি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা অনির্বাচিত হয়েও নির্ধারণ করেন দেশের পররাষ্ট্রনীতি। যেকারণে কূটনীতিতে তাদের প্রধান মুখ হয়ে ওঠাটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। এমনকি দেশটির সরকারে বেসামরিক ব্যক্তি থাকলেও।
ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সান্নিধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির (ডানে)। ছবি : আলজাজিরা
২০২২ সালে সেনাপ্রধান হওয়ার পর মুনিরের মনোযোগ ছিল দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। তবে, গত দেড় বছরে তিনি ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও তেহরানে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন বিশ্ব দূত হিসেবে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তিনি দুইবার হোয়াইট হাউস সফর করেন, ক্রিপ্টো ও খনিজ উত্তোলন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানি চুক্তি তদারকি করেন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষর করেন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি।
মুনিরের বিষয়ে লোধির পর্যবেক্ষণ, ঘন ঘন সফর ও যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন নেতা ও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে খুবই পারদর্শী। তিনি অলস প্রকৃতির নন। তিনি এমন কেউ নন যিনি ফোনের জন্য অপেক্ষা করবেন। তার কূটনৈতিক তৎপরতায় আমরা যেমনটা দেখেছি, তিনি নিজেই ফোন ধরেন।
একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মুনিরের বর্তমান প্রভাবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তার বিশ্বস্থতা। লবিং, তোষামোদ এবং চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন-পাকিস্তানি সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন তিনি।
এছাড়া তিনি বেশ কয়েকজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে তুলে দেন ট্রাম্পের হাতে। যাদের পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এটিকে ট্রাম্প উল্লেখ করেন নিজের বিজয় হিসেবে।
এরপর, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে ওয়াশিংটন। পাকিস্তান ট্রাম্পকে সমর্থন জানায় এবং এমনকি তার নাম প্রস্তাব করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য।
মুনির সেই যুদ্ধে সফলভাবে বিজয় অর্জন করেন, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তার অবস্থানকে করে আরও উন্নত।
দুই মাস পর ওয়াশিংটনের লবিস্টদের পেছনে পাকিস্তানের ৫০ লাখ ডলারে বেশি খরচ করে হোয়াইট হাউসে ব্যক্তিগত মধ্যাহ্নভোজের দাওয়াত পান মুনির। তোষামোদ এবং পাকিস্তানে তেল থেকে শুরু করে খনিজ ও ক্রিপ্টো পর্যন্ত বিভিন্ন লাভজনক বিনিয়োগের চুক্তি করে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হন তিনি।
ট্রাম্প মুনিরকে এতটাই পছন্দ করেন যে, কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ জানায় রিপাবলিকান প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তাকে অভিহিত করেন “আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে।
ইরানের ইসলামিক প্রসাশনের সাথেও দক্ষতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে করেন মুনির। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা এবং পরে তেহরানের ওপর ১০ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের পক্ষে কড়া নিন্দা জানায় পাকিস্তান। এভাবেই তেহরানের বিশ্বস্থতা অর্জন করে ইসলামাব। এছাড়া পাকিস্তানের শিয়া এমনকি সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও জনমত ব্যাপকভাবে ইরানের পক্ষে।
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের রিডার অবিনাশ পালিওয়ালের মত, প্রতিকূল পরিস্থিতি পেয়েছিলেন মুনির, তা খুব ভালোভাবে সামলেছেন মুনির। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনকে সফলভাবে সামলানো, ইরানের বিশ্বস্থতা অর্জন, মধ্যপ্রাচ্যে নিজ ব্যক্তি পরিচয় তৈরি।
বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, অনেক কিছুই নির্ভর করছে দ্বিতীয় দফার আলোচনার সাফল্যের ওপর—ব্যক্তিগতভাবে মুনিরের জন্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার পরিচিতি পাওয়ার জন্য।
বিশ্লেষকরা স্বীকার করেছেন, এই মধ্যস্থতার পেছনে মুনিরের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে স্থায়ী চুক্তি করলেও মুনিরের ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে না বলে মনে করেন পালিওয়াল। তার দাবি, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষায় একটি প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে অনেক কিছুই নির্ভর করছে।
পালিওয়াথের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এখন একেবারে মূল ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান। মুনির হয়ে ওঠতে পারেন বৈশ্বিক শান্তি ও মধ্যস্থতার প্রতীক।
তার ধারনা, তেহরান-ওয়াশিংটন স্থায়ী চুক্তি হলে মুনির এমন একজন ব্যক্তিতে পরিণত হবেন, ভবিষ্যত মধ্যপ্রাচ্যে যার ভূমিকা হবে আরও শক্তিশালী।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত


