কেন বেলুচিস্তান হাতছাড়া করতে চায় না পাকিস্তান

মানচিত্রে বেলুচিস্তান
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা ও সোনার খনি, বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, ক্রোমাইটসহ পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান খনিজসম্পদের বড় অংশই বেলুচিস্তানে। অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই প্রদেশকে ইসলামাবাদ দেশের ‘সম্পদের সিন্দুক’ হিসেবে দেখে। তাই সাত দশক ধরে স্বাধীনতার দাবিতে চলা বেলুচ বিদ্রোহ যতই তীব্র হোক, অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর কোনো সুযোগ দিতে চায় না পাকিস্তান।
সম্প্রতি বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা প্রসঙ্গটি বেশ জোরেশোরে আলোচনায়। সাত দশক ধরে, বলতে গেলে পাকিস্তান গঠনের কিছুদিন পরই অঞ্চলটির মানুষ ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে শোষণ-বঞ্চনার অভিযোগ আনতে শুরু করেন। ধারাবাহিক অভিযোগ একপর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়।
বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএফ) একের পর এক আক্রমণ নাস্তানাবুদ করে রেখেছে দেশটির সরকারি বাহিনীকে। অঞ্চলটির ৮০ ভাগ জায়গা নিয়ন্ত্রণের দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বরাবরের মতোই কঠোর অভিযান চালিয়ে শক্ত হাতে আন্দোলন দমনের ঘোষণা দিয়েছে। শুধু এবারই নয়, যখনই বেলুচ বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিতে চেয়েছে; তখনই নির্মমভাবে আন্দোলন শেষ করেছে ইসলামাবাদ। কারণ, আয়তন ও খনিজসম্পদের পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকে এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
বৃহত্তম প্রদেশ
পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত, বেলুচিস্তান আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে এটি সবচেয়ে পিছিয়ে। এই বিশাল ভূখণ্ডটি পাকিস্তানকে কৌশলগত গভীরতা দেয়। এ ছাড়া পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের একটি বড় অংশ এ প্রদেশে অবস্থিত।
প্রাকৃতিক সম্পদ
বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের সিংহভাগ খনিজসম্পদ মজুদ আছে। ঐতিহাসিক সুই গ্যাসক্ষেত্রসহ প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা, কয়লা, ক্রোমাইট, মার্বেলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে বেলুচিস্তানের মাটিতে।
প্রদেশের চ্যাগাই জেলায় অবস্থিত ‘রেকো ডিক’ হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অনাবিষ্কৃত তামা ও সোনার খনি। এটি ইরান ও আফগানিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি একটি মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। এই খনিজভাণ্ডারটি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খনিটিতে প্রায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন টন আকরিকের বিশাল মজুদ রয়েছে। এতে প্রায় ৪১ দশমিক ৫ মিলিয়ন আউন্স সোনা এবং বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের তামা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খনিটির মোট সম্ভাব্য মূল্য ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং আগামী ৩০-৪০ বছরে এটি প্রায় ৫০-৭৪ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব বা ক্যাশ-ফ্লো আসতে পারে।
খনিটি পুরোদমে চালু হলে এটি স্থানীয়ভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং পাকিস্তানের খনিজ রপ্তানি শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব এই খনি খাতের উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এর অংশীদারত্ব কেনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।
কৌশলগতভাবে মূল্যবান গোয়াদার বন্দর
বেলুচিস্তান প্রদেশের গোয়াদার হরমুজ প্রণালির ঠিক বাইরে আরব সাগরের তীরে অবস্থিত একটি কৌশলগত গভীর সমুদ্রবন্দর। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) প্রধান প্রকল্প এটি। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াকে মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে বিকল্প বাণিজ্য পথ করার পরিকল্পনা হচ্ছে। এটি চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া এটি পারস্য উপসাগরের মোহনার কাছে থাকায় মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য একটি সংক্ষিপ্ততর ও অধিকতর নিরাপদ বিকল্প নৌপথের সুযোগ করে দেবে। এর মধ্যে বন্দরটি তার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে বাড়িয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের মতো গন্তব্য থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৃহৎ আকারের কার্গো ও ইস্পাতের চালান পরিচালনা করেছে।
সিপিইসি প্রকল্পটির মাধ্যমে পশ্চিম চীন এবং মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত করে শক্তিশালী স্থল ও রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য কাজ চলছে।
সীমান্ত ব্যবহার
বেলুচিস্তানের ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত হয়। এর মাধ্যমে ইসলামাবাদ আরব দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রক্ষা করে। সম্প্রতি তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিশ্বের নজরে আসার পথটিও তৈরি করেছে এ সীমান্ত।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বেলুচিস্তান ঘিরেই চীনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সিপিইসি প্রকল্প। যেটি চালু হলে অঞ্চলটি হবে পাকিস্তানের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি এটি বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। এ ছাড়া ইরান, আফগানিস্তান এবং আরব সাগরের সংযোগস্থলে বেলুচিস্তানের কৌশলগত অবস্থান একে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্ব এনে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে এর নৈকট্য বেলুচিস্তানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর এবং ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। এর ৭৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরব সাগর উপকূলরেখা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য এর গুরুত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা
পাকিস্তান অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বেলুচিস্তানের স্থিতিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ইসলামাবাদের বেশ কিছু এমন সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তায় কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হয়।
প্রদেশের ওরমারাতে অবস্থিত জিন্নাহ নেভাল বেস পাকিস্তান নৌবাহিনীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি। এ ছাড়া গোয়াদর বন্দর এলাকায় থাকা পিএনএস আকরাম ঘাঁটি সমুদ্র বাণিজ্যের নিরাপত্তায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।
বেলুচিস্তানের চাগাই জেলার পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৯৮ সালের মে মাসে পাকিস্তান তাদের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক অঞ্চল। এ ছাড়া লাসবেলা জেলায় রয়েছে একটি সামরিক রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও পরীক্ষাকেন্দ্র।
কোয়েটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই অবস্থিত পিএএফ বেস সামুংলি দেশটির বিমানবাহিনীর একটি প্রধান ও সক্রিয় যুদ্ধকালীন ঘাঁটি। এখানে মূলত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর উন্নত যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকে এবং এটি আকাশসীমা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ওয়াশুক জেলায় অবস্থিত শামসি এয়ারফিল্ড প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিমানঘাঁটি। অতীতে মার্কিন বাহিনী এ ঘাঁটিটি আফগানিস্তানে ড্রোন অভিযান পরিচালনার জন্য লিজ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে এই ঘাঁটি আবারও চালু করার পরিকল্পনা করছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তান ও বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সেনা কর্মকর্তাদের কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিশ্ব জুড়ে সুপরিচিত কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ এখানেই অবস্থিত। এ ছাড়া এখানে আছে পাকিস্তানের অন্যতম ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট, যেখান থেকে পুরো দেশের নিরাপত্তা ও বিদ্রোহ দমন অভিযান পরিচালনা করা হয়।




