জাতিসংঘে ইরানি প্রেসিডেন্টের পূর্ণাঙ্গ ভাষণটি পড়ুন

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বুধবার ভাষণ দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। ভাষণের সময় তিনি নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও হামলায় নিহত ইরানি স্কুলশিশুদের ছবি তুলে ধরেন। ইরান কখনো মাথা নত করবে না বলে ভাষণে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। এ সময় বেসামরিক হতাহতের প্রসঙ্গ উঠলে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিনিধি।
ভাষণে পেজেশকিয়ান ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার হিসেবে তুলে ধরেন এবং নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান।
এখানে তার পূর্ণাঙ্গ ভাষণ তুলে ধরা হলো—
‘বিসমিল্লাহির রহমানির
রহিম। মাননীয় সভাপতি, মাননীয় মহাসচিব, সম্মানিত প্রতিনিধিবৃন্দ
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গতকাল বলেছেন,
আমরা সন্ত্রাসী।অথচ আমরাই
সন্ত্রাসবাদের শিকার।
আমি এমন এক ইরান থেকে এসেছি, যেখানে বেআইনিভাবে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই এরা
আমাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে।
আমি এমন এক ইরান থেকে এসেছি, যেখানে একটি বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়েছে। আপনারা এই শিশুদের দেখছেন—এই শিশুদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়েছে এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে; এমন অস্ত্র দিয়ে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যবহার করেছে। তাদের কোনো অপরাধ ছিল না, তারা কোনো অপরাধ করেনি।
লামার্দ ইরানের একটি ছোট শহর। সেখানে একটি ক্রীড়া ভবন রয়েছে। শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করত। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ক্লাস্টার বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে, যে বোমাগুলো বিস্ফোরণের সময় হাজার হাজার টুকরায় ছড়িয়ে পড়ে। তারা আমাদের বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে; মানুষ, নারী ও শিশুদের হত্যা করেছে—নিরপরাধ শিশুদের, যারা আসলে কোনো অপরাধই করেনি। যারা সন্ত্রাসী এবং যারা সন্ত্রাসী তৈরি করে, তারাই আমাদের বলে—তোমরাই সন্ত্রাসী, আমরা শুধু আত্মরক্ষা করছি। আমরা সন্ত্রাসী নই।
আমাদের নিরপরাধ মানুষ আসলে সেই নৃশংস হামলার লক্ষ্যবস্তু, যা তারা আমাদের দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর আমরা শক্তভাবে আত্মরক্ষা করেছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে, আর আমাদের জনগণ দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করেছে এবং তাদের জবাব দিয়েছে।
আমাদের জনগন প্রকৃতপক্ষে এমন নিষ্ঠুর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা তারা আমাদের দেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে; আর আমরা শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেছি। আমেরিকা ও ইসরাইল সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করেছে, আর আমাদের জনগন শক্তি দিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং জবাব দিয়েছে।
আমরা তাদের সামনে মাথা নত করিনি, বরং জবাব দিয়েছি।
কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষকে আঘাত করিনি। তারা আমাদের বিদ্যালয়, আমাদের হাসপাতাল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের সেতু এবং আমাদের অবকাঠামোর ওপর হামলা করেছে।
এসবই আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
আমার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তারা ইসমাইল হানিয়াকে তেহরানে হত্যা করেছে। ইসরায়েল
নিজে খেয়াল খুশি ও ইচ্ছে মতো যে কোনো সরকার, যে কোনো শাসনব্যবস্থা, যে কোনো অঞ্চলকে বোমা হামলা করে এবং মানুষ হত্যা
করে।
গাজায় ৮০ হাজারেরও বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এক লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত
হয়েছে। তারা তাদের হাতে থাকা অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণহত্যা চালাচ্ছে। এরপর
তারা বলে, অন্যরা সন্ত্রাসী,
অন্যরাই অস্থিতিশীলতার কারণ।
আমরা কি অস্থিতিশীলতার কারণ? আমরা, যারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই, যারা মাথা নত করতে চাই না—আমরা কি অস্থিতিশীলতার কারণ?
আর যারা হত্যা করছে,
হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং অপরাধ
করছে, তারা যদি নিরাপত্তা ও শান্তির
দূতে পরিণত হয়েছে?
তারা কোনো সীমারেখা মানে না; আন্তর্জাতিক আইনের
কোনো নিয়মই তারা মেনে চলে না। এটাই আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। আমরা কিছু চাই না;
আমরা আমাদের উত্তর খুঁজে পেয়েছি।আমাদের
শক্তি প্রয়োজন। কারণ যে জাতি নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তাকে পদদলিত করা হয়।
আজকের পৃথিবী এমন এক পৃথিবী, যেখানে ক্ষমতাবানরা
জনগণ, মানবতা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের কথা চিন্তা করার পরিবর্তে
ধ্বংস, বিপর্যয় ও সর্বনাশের কারণ
হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাকে ধ্বংস করতে চায়, তার গায়ে সন্ত্রাসীর তকমা লাগিয়ে দেয়।
গত ২০০ বছর ইরান কোনো দেশে হামলা করেনি। আমরা সবসময় নিজেদের রক্ষা করেছি। অথচ এখন আমাদেরই
অভিযুক্ত করা হচ্ছে যে আমরা সন্ত্রাসী এবং আমরা এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার কারণ। এ
কারণেই আমরা নিজেদের জন্য যে কৌশল বেছে নিয়েছি, তাতে আমাদের শক্তি
প্রয়োজন—নিজেদের রক্ষা করার জন্য। আগ্রাসন চালানোর জন্য আমরা শক্তি চাই না।
আমরা উন্নয়নের জন্য জ্বালানি চাই। বোমা তৈরি, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো
কিংবা সমাজকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য আমরা শক্তি চাই না। বরং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায়
আমরা অংশীদার হতে চাই।
গত সাত মাস ধরে ইরানি জনগণ—আমাদের দেশের মানুষ—প্রতি রাতে রাস্তায় ছিল, যাতে তারা মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েল উসকানি দিয়ে যাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে, তারা যেন দেশের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে
না পারে।
সাত মাস ধরে ইরানের জনগণ দিন-রাত রাস্তায় রয়েছে। জনগণই আমাদের শক্তি এবং আমরা জনগণের
শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছি।
ইরানকে এতটাই শক্তিশালী হতে
হবে যে তার অস্তিত্ব ও অগ্রগতিকে যেন কেউ হুমকির মুখে ফেলতে না পারে; এতটাই দায়িত্বশীল হতে হবে যে তার শক্তি যেন আধিপত্যের
জন্য ব্যবহার না হয়; এবং এতটা দূরদর্শী
হতে হবে, যাতে প্রতিবেশীদের
অনিরাপত্তার মধ্যে নিজের নিরাপত্তা খুঁজতে না হয়।
আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করেছি, যাতে কেউ মনে না করে যে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা
চালালে তার কোনো জবাব দেওয়া হবে না। ইরানের সামরিক শক্তি আত্মরক্ষার জন্য। তবে আমরা
স্পষ্ট করে বলছি, আমাদের দেশকে রক্ষা
করার জন্য আমরা কারও অনুমতি নেব না।
আমাদের জ্বালানি প্রয়োজন উন্নয়নের জন্য। বহু বছর ধরে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সেন্ট্রিফিউজ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা ও বোমার ভাষায় কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জাতির কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকারেরই একটি অংশ।পারমাণবিক শক্তি আমাদের রোগীদের চিকিৎসার জন্য, কৃষিতে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য, শিল্পে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য এবং ভবিষ্যতের টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন।
ইরান মেনে নেবে না যে পারমাণবিক জ্ঞান কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার হয়ে থাকবে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্রকে নিরাপত্তার উপায় মনে করে না। কিন্তু বিজ্ঞান, শিল্প ও শান্তিপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রে নিজের অধিকার থেকেও সরে আসবে না।
আমরা স্পষ্টভাবে বলছি—পারমাণবিক
অস্ত্র নয়, আবার পারমাণবিক জ্ঞান
থেকেও বঞ্চিত নয়। ইরানের পারমাণবিক অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রে সমাধান হবে না; সমাধান হলো এমন একটি চুক্তি,
যা বিশ্বকে ইরানের কর্মসূচির
শান্তিপূর্ণতার ব্যাপারে একটি বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেবে এবং ইরানের জাতিকে তার অধিকার
সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দেবে।
আমাদের তৃতীয় নীতি হলো নিরাপত্তার জন্য অংশীদারত্ব।
আমরা এমন একটি অঞ্চলে বসবাস করি, যেখানে যুদ্ধ কোনো
সীমান্ত মানে না; একটি দেশের সংকট তার
প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই ইরান তার প্রতিবেশীদের নিজের নিরাপত্তার
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের শক্তিশালী দেখতে চাই।
হরমুজ প্রণালীতে এটা হতে পারে না যে সবাই এই জলপথ ব্যবহার করবে, অথচ ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথের রক্ষক একটি দেশকে নিষেধাজ্ঞার
মাধ্যমে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে।
একদিকে আমাদের জন্য এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, অন্যদিকে সেই একই জলপথ দিয়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন দেশ ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনীয়
জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এভাবে চলতে পারে না। তারা এমন কাজ করতে পারে না, আর আমরা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের পরিস্থিতি
তৈরি হতে দেব না। শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি কিংবা যুদ্ধের বিস্তার কখনো নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে পারে না। উপকূলীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এবার ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে বলি, ফিলিস্তিন এখনো বিশ্ববিবেকের ওপর একটি ক্ষত হয়ে আছে এবং গাজায় এখনো বেসামরিক মানুষের
দুর্ভোগ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই চোখে পড়ছে।দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন
প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে,
কিন্তু দখলদারিত্ব ও সহিংসতা
অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনকে উপেক্ষা আমরা শান্তির কথা বলতে পারি না। পশ্চিম এশিয়ায় ফিলিস্তিনের অধিকার ও তাদের
প্রতি ন্যায়বিচার ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না।
যতদিন পৃথিবীতে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন ও অবিচার
থাকবে, ততদিন প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
এর একটি রূপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য কোনো রূপে, এমনকি আরও শক্তিশালী রূপে, তা আবারও আবির্ভূত হতে পারে।
নিরবচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজা প্রমাণ করেছে যে মানুষের বিশ্বাস ও প্রতিরোধকে বোমা ও অবরোধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। এটাই মানুষের স্বভাব, এটাই মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
কোনো মানুষকে যদি তার ভূমি
থেকে বিতাড়িত করা হয়, সে প্রতিরোধ করবে।
কোনো মানুষের ঘরবাড়িতে যদি বোমা হামলা করা হয়, সে প্রতিরোধ করবে। সে প্রতিরোধ না করে কী করবে?
সে কি মেনে নেবে যে তার ওপর
জোর-জবরদস্তি করা হোক? সে কি মেনে নেবে যে
তাকে তার ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হোক, আর এসব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা নীরব থাকবে? আর তারা যদি নিজেদের রক্ষা করতে চায়, তখন বলা হবে—এরা সন্ত্রাসী?
আজ আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি,
সেখানে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক
ভাষা ও চিন্তাধারা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমাদের অঞ্চলের সমস্যাগুলো দূরবর্তী শক্তিগুলোর
ক্ষমতার লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠার আগেই, সেগুলোর সমাধান এই অঞ্চলেই এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক উদ্যোগের মাধ্যমেই
করা সম্ভব। কৌশলগত স্বাধীনতার
অর্থ হলো—কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন কখনোই প্রতিবেশী কোনো দেশের
বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়।
এখন আমি আমাদের দেশের ওপর
হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এর পরিকল্পনা এবং
তা বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের সবার উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাই;
আমাদের জনগণ সামরিক শক্তি এবং তাদের ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তগুলোর পরিণতি খুব কাছ থেকে
অনুভব করেছে। তারা ইরানের সহনশীলতা ও প্রতিরোধের ক্ষমতা পরীক্ষা করেছে। এখন তারা ভালোভাবেই
জানে যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। ইরান কখনো কোনো যুদ্ধ
শুরু করেনি। বরং আমরা সবসময় আলোচনার টেবিলের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার দেখিয়েছি।যুদ্ধ
আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে নিজেদের রক্ষার জন্য আমরা
যুদ্ধকে ভয় পাই না এবং শান্তির জন্য আলোচনা থেকেও পিছিয়ে যাই না। প্রিয় ইরানের সুরক্ষার
জন্য আমরা প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত, এবং শেষ পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে
দাঁড়িয়ে থাকব।
সম্মানিত উপস্থিতি, এই সম্মেলনের মূল
বিষয় হলো পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন।শুধু কথার মাধ্যমে আস্থা তৈরি হয় না; আস্থা পুনর্গঠনের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড
প্রয়োগ করতে হবে এবং দ্বৈত মানদণ্ডের অবসান ঘটাতে হবে। এই অঞ্চলের পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী
অস্ত্র ইসরায়েলের হাতে রয়েছে, অথচ পরিদর্শনের দাবি
তোলা হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে। ইসরায়েল গাজায় ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, অথচ ইরানকে আলোচনার টেবিলে থাকার সময় বোমা হামলার শিকার হতে হয়েছে।
ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তারা পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি—এনপিটি-এর সদস্য নয়। অথচ এত দীর্ঘ সময় ধরে তারা একজন আন্তর্জাতিক পরিদর্শককেও তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তারপরও তারা শত শত কোটি ডলারের বিনা মূল্যের অস্ত্র পায় এবং এমন এক ধরনের দায়মুক্তি ভোগ করে, যার ফলে তারা ইচ্ছামতো যে কোনো দেশের রাজধানীতে বোমা হামলা চালাতে পারে।
আমি আবারও বলছি—পারমাণবিক অস্ত্র ইসরায়েলের হাতে, অথচ পরিদর্শক পাঠানো হচ্ছে ইরানে। ইসরায়েল হত্যা করে, অথচ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ইরান। এটা এমন এক করুণ বাস্তবতা যে, আপনি যাকেই বলবেন, সে শুনে হাসবে। সে হত্যা করে, আর আমরা নিষেধাজ্ঞার শিকার হই। এরপর সেই নিষেধাজ্ঞা আসলে দরিদ্র মানুষ, রোগী এবং নিরপরাধ জনগণকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। আর এটাই সেই কাজ, যা যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এবং বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে করতে চায়—যাতে জনগণকে তাদের অশুভ ও নোংরা উদ্দেশ্যের বলি বানানো যায়। আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, তাহলে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী—উভয়কেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। মানবাধিকারকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ইরান কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না; চায় সমান অধিকার। ইরান তার দীর্ঘ ইতিহাস থেকে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছে—শক্তি ছাড়া এই পৃথিবীতে নিরাপদ থাকা কঠিন। কিন্তু যে বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষা বোঝে, সেখানে কখনোই স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক আইন যদি
কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তা ক্ষমতাবানদের
স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তাহলে আরও অনেক দেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের
শেষ পর্যন্ত নিজেদের শক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। আর সেটিই আমাদের সবার জন্য আরও বিপজ্জনক
একটি পৃথিবীর সূচনা করবে। আমরা একবিংশ শতাব্দীকে যেন শক্তিশালীদের জোর-জবরদস্তি
ও ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার যুগে পরিণত হতে না দিই। আমাদের এমন একটি পৃথিবী তৈরি
করা উচিত নয়, যেখানে সামরিক শক্তি বৈধতার স্থান দখল করবে; নিষেধাজ্ঞা কূটনীতির স্থান দখল করবে; হত্যা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের
স্থান দখল করবে; আর যুদ্ধ সংলাপের স্থান দখল করবে। ইরান বিশ্বের
দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমরা বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে নয়, শান্তি ও ন্যায়বিচারের দিকে আহ্বান জানাই—দুর্বলতার কারণে নয়, বরং নিজেদের শক্তির ওপর আস্থা এবং এই সত্যের উপলব্ধি
থেকে যে এই অঞ্চলে কেউ একা নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না। হয় আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, নয়তো একসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতা সহ্য করব।
আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিক
মর্যাদা প্রতিটি জাতির জন্য সমান অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে—যে অধিকার কোনোভাবেই
কেড়ে নেওয়া যাবে না।
আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে কোনো জাতিকে প্রান্তিক করে রাখা হবে না, ক্ষমতার কোলাহলে কোনো মানুষের কণ্ঠ হারিয়ে যাবে না এবং কোনো শক্তিই অন্য কোনো জাতির ভবিষ্যৎ তাদের হয়ে নির্ধারণ করার অধিকার রাখবে না।একটি ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে হবে সব জাতির সমতা, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা এবং সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত ইচ্ছার ভিত্তিতে। কারণ যে শান্তি সবার জন্য নয়, তা প্রকৃত শান্তি নয়; আর যে ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়, তা প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়।
সবশেষে বলতে চাই, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিশ্বের জনমত, চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞদের কাছে শক্তির দাপট ও জোর-জবরদস্তির রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রকাশ। এই ধরনের বক্তব্য জাতিসংঘের সনদের সুস্পষ্ট নীতি ও মূল চেতনারও পরিপন্থী। তিনি যেন জেনে রাখেন—হুমকি আমাদের জাতিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে, আরও শক্তিশালী করবে এবং ইরানের জনগণের প্রতিরোধের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে। ইরানের জনগণ কখনো শক্তির কাছে মাথা নত করবে না। যারা আমাদের ওপর আগ্রাসন চালাবে, তারা শেষ পর্যন্ত তাদের সেই আগ্রাসনের পরিণতি উপলব্ধি করতে বাধ্য হবে।ট্রাম্প এবং যারা জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের এই বাস্তবতা বুঝতে হবে।আমরা সংলাপের জন্য প্রস্তুত। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান চাই। কিন্তু তারা যেন স্পষ্টভাবে জেনে রাখে—শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান আমরা মেনে নেব না। ধন্যবাদ।’
অনুবাদ: মুহাম্মাদ রুস্তম আলী, ইরান থেকে





