‘অস্তিত্বের লড়াইয়ে’ ইরান, মার্কিন অবরোধের জবাবে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি
- ‘ভারী আঘাত’ সত্ত্বেও দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি তেহরানের
- হরমুজ থেকে ইসরায়েল ঘিরে বহু ফ্রন্টের কৌশল?

মার্কিন অবরোধ ও সামরিক অভিযানের মুখে তেহরানের ঘোষণা, তারা নতি স্বীকার করবে না।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যে জাতি দাঁড়িয়ে থাকার বার্তা দেয়, তার কাছে যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের হিসাব নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াই। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এমনই বার্তা দিচ্ছে ইরান। মার্কিন অবরোধ ও সামরিক অভিযানের মুখে তেহরানের ঘোষণা, তারা নতি স্বীকার করবে না। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে তারা।
“ইরান এখন একটি অস্তিত্বের যুদ্ধে রয়েছে”, বলেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের মুখপাত্র হাসান কাশকাভি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও সামরিক চাপের মুখে তেহরান আত্মরক্ষার পথেই এগোচ্ছে৷
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) তাসনিম নিউজের খবরে বলা হয়েছে, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স ও নৌবাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। ইরানি বাহিনীর দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করা হয়।
আইআরজিসির বক্তব্য, ওই মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানি জাহাজকে হয়রানি করছিল এবং হরমুজ প্রণালীর নৌ অবরোধে অংশ নিয়েছিল। হামলার পর জাহাজ দুটি সংঘর্ষ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় বলেও দাবি করেছে তেহরান। তবে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং কোনও মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
একই সঙ্গে আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর পর পাল্টা হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেলবাহী জাহাজ এবং আরও তিনটি যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত জাহাজ লক্ষ্য করা হয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, ইরানের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করতেই এই নৌ অবরোধ চালানো হচ্ছে।
কাশকাভি বলেছেন, “এই অবরোধ কখনও থাকা উচিত ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “চার দিন আগে আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট বিশকেক সম্মেলনে বলেছিলেন, আমরা আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন না; বরং তাঁরা অবরোধ আরও কঠোর করছেন।”
তেহরানের দাবি, আলোচনার দরজা তারা বন্ধ করেনি। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের সামনে নতি স্বীকার করবে না ইরান। বরং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে ইসরায়েলকে ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য ‘বহুমুখী’ কৌশলের দাবি। রবিবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের সংঘাতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুতিদের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে পারে তেহরান।
ইসরায়েলি মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, আইআরজিসির কুদস ফোর্স আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। তবে ইরান প্রকাশ্যে এমন কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেনি।
আল জাজিরাকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই বলেছেন, “ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্তত সামরিক দিক থেকে। আমেরিকানরা তাদের বড় ধরনের আঘাত করেছে, কিন্তু ইরান এখনও পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা এখনও তাদের রয়েছে।”
পুসতাই আরও বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।”
তাঁর মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালী ঘিরে নৌ উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এখন শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ, গাজা, লেবানন ও ইয়েমেন–সবকটি ফ্রন্ট একসঙ্গে জড়িয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।
কারণ এখন প্রশ্ন শুধু একটি যুদ্ধের নয়। প্রশ্ন হলো, পরবর্তী বিস্ফোরণ কি আর কোনও একটি সীমান্তে থামবে, নাকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে টেনে নেবে দীর্ঘ সংঘাতের দিকে?





