সুয়েজ থেকে হরমুজ
নতুন মোড়কে পুরনো ইতিহাস

ইতিহাস অনেক সময় সরলরেখায় চলে না, এটি বৃত্তে ঘোরে। সময়, প্রযুক্তি ও পতাকা বদলায়; কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি, কৌশলগত ভুল এবং পরাশক্তির সীমাবদ্ধতার গল্প বারবার ফিরে আসে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট আর ২০২৬ সালের হরমুজ সংকট— এ দুই ঘটনা সেই একই চক্রের দুই ভিন্ন অধ্যায়।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল এক গোপন সামরিক পরিকল্পনায় মিসরে আক্রমণ করে। লক্ষ্য ছিল খালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং নাসেরকে দুর্বল করা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও ব্রিটেন শেষ পর্যন্ত পিছু হটে। কারণ, যুদ্ধটি আর সামরিক ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরীক্ষা।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা ছিল সবচেয়ে বড় কারণ। তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার স্পষ্টভাবে এই অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করেছিল, এই যুদ্ধ আরব বিশ্বকে সোভিয়েত বলয়ে ঠেলে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
দ্বিতীয়ত, সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি হুমকি দেয় যে তারা মিসরের পক্ষে হস্তক্ষেপ করতে পারে, এমনকি লন্ডন ও প্যারিসের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ইঙ্গিতও দেয়। ফলে শীতল যুদ্ধের ছায়া এ সংকটকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ পাউন্ডকে সমর্থন না করার ইঙ্গিত দিলে ব্রিটেনের মুদ্রাবাজার ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সাম্রাজ্য টিকে ছিল অর্থনীতির ওপর এবং সেই অর্থনৈতিক ভিত্তি হুমকির মুখে পড়েছিল। ফলে ব্রিটেন বুঝে যায় তাদের কাছে সামরিক শক্তি থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আর আগের মতো নেই। এখান থেকেই শুরু হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘পোস্ট-এম্পায়ার রিয়েলিটি’।
২০২৬ সালের হরমুজ সংকটে দেখা গেল ভিন্ন যুগের ভিন্ন দৃশ্যপট; কিন্তু একই কাঠামো। হরমুজ প্রণালিকে অনেকেই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বলে থাকেন। পৃথিবীর মানচিত্রে এটি একটি সরু নীলরেখা মাত্র। কিন্তু এর কৌশলগত গুরুত্ব এতটাই বেশি যে অনেক সময় এটিকে আধুনিক বিশ্বের ‘এনার্জি আর্টারি’ বলা হয়। পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য এ পথের ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার— সবাই কোনো না কোনোভাবে এ রুট ব্যবহার করে। তাই হরমুজে উত্তেজনা মানে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়; এটি টোকিও, বেইজিং, সিউল, নয়াদিল্লি ও ঢাকা— এমনকি ইউরোপের অর্থনীতির সমস্যাও।
এ বছরের শুরুতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে, তখন অনেকেই বিষয়টিকে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য সংকট হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুত পরিস্থিতি অন্য মাত্রা নিতে শুরু করে।
ইরান পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয় যে তারা চাইলে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তেলের দাম ওঠানামা করে, এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আর বৈশ্বিক শিপিং খরচ বেড়ে যায়।
সুয়েজ যুগে বিশ্ব ছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক— যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। সিদ্ধান্ত ছিল তুলনামূলক সীমিত শক্তির হাতে।
কিন্তু এখনকার হরমুজ যুগ বহুমেরুকেন্দ্রিক। চীন এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি ক্রেতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার। রাশিয়া ভূরাজনৈতিকভাবে সক্রিয় খেলোয়াড়। ভারত দ্রুত শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। আর উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন আগের মতো একপক্ষীয়ভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।




