ইরানে অনির্দিষ্টকাল বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আমিরাতের

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবার সরাসরি আঘাত হানল দেশ দুটির অর্থনৈতিক সম্পর্কে। সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বাণিজ্যিক বিনিময় এবং আর্থিক লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে আবুধাবি। সিদ্ধান্তটি শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়; ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র দুবাইয়ের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হঠাৎ এ নিষেধাজ্ঞাটি শোরগোল তুলেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও।
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ভোররাত ৪টায় এ নিষেধাজ্ঞা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব বাণিজ্য, বাণিজ্যিক লেনদেন ও আর্থিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
আগের দিন (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে আমিরাতের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। ৭টা ২ মিনিটে আবার তুলে নেয় সতর্কতা। এরপরই দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান থেকে আমিরাতের দিকে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছিল। একটি আমিরাতের জলসীমার বাইরে এবং অন্যটি জলসীমার ভেতরে সাগরে পড়ে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সামুদ্রিক নৌ চলাচলকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে মূল্যায়ন করেছে আমিরাত। তবে ইরান এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছে।
এর ৯ ঘণ্টা পরই ইরানের সঙ্গে সব বাণিজ্যিক ও আর্থিক কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা জানিয়েছে, উত্তেজনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে আবুধাবি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দুবাইয়ের এ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য সুখকর নয়। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দুবাই ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনঃরপ্তানি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। বিভিন্ন দেশের পণ্য দুবাইয়ের বন্দর, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ও আর্থিক অবকাঠামো ব্যবহার করে ইরানের বাজারে পৌঁছেছে। ফলে এই চ্যানেল বন্ধ হলে তেহরানের আমদানি, সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
দুই দেশের বাণিজ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে ছিল। ফলে স্থগিতাদেশের প্রভাব শুধু ইরানি ব্যবসায়ীদের ওপর নয়, আমিরাতভিত্তিক আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং, লজিস্টিকস, বন্দর ও আর্থিক খাতেও পড়তে পারে। পণ্য পরিবহন ও বিকল্প সরবরাহ পথ খুঁজতে গিয়ে ব্যবসার খরচ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অবশ্য এর প্রভাব আমিরাতের বাজারেও পুরোপুরি এড়ানো যাবে না। ইরান থেকে আসা কিছু পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। তবে আমিরাতের কর্তৃপক্ষ বলছে, স্থানীয় উৎপাদন এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব আর্থিক বাজারেও দেখা গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার পর আমিরাতের শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে; আবুধাবির সূচক কমেছে দশমিক ৯ শতাংশ এবং দুবাইয়ের সূচক দশমিক ৩ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, নিরাপত্তাঝুঁকি এখন সরাসরি ব্যবসায়িক আস্থাকেও প্রভাবিত করছে।
এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি নাগরিকদের ভিসা বা রেসিডেন্সি বাতিল এবং ইরানকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার দাবি ছড়িয়েছে। তবে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ এসব দাবিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমিরাতকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হলেও ইরানি শ্রমিকদের রেসিডেন্সি বাতিল বা তেহরানকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত আমিরাত নিশ্চিত করেনি।’
সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্য স্থগিতের সিদ্ধান্তকে সাময়িক কূটনৈতিক পদক্ষেপের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের পুনঃরপ্তানি ভূমিকা বন্ধ হলে ইরানের ওপর এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে। আবার নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ হলে আমিরাতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিকল্প বাজার ও সরবরাহপথ খুঁজতে হবে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই বাণিজ্যিক বিচ্ছেদের পরিণতি কতটা গভীর হবে। এর প্রভাব জ্বালানি পরিবহন, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহেও পড়তে পারে। ফলে পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; পুরো উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখন সবার নজর সেদিকেই।



