ধ্বংসস্তূপে শিশুর খাতা, ট্রেনের কামরায় যুদ্ধের স্মৃতি; ইরানের পথে পথে অন্য এক বাস্তবতা

সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধ থেমে গেলেও তার ক্ষত সারে না। কোথাও ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকে শিশুর খাতা, কোথাও সমুদ্রবন্দরে থমকে থাকে জাহাজ, আবার কোথাও শোকের মিছিল পরিণত হয় জাতীয় ঐক্যের প্রদর্শনীতে। যুক্তরাষ্ট্র - ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে মানুষের মুখে উঠে এসেছে একই যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন গল্প। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত ইরানের মানুষের কাছে একই অর্থ বহন করছে না। কারও কাছে তা জাতীয় ঐক্যের কারণ, কারও কাছে আরও কঠোর দমন পীড়নের সময়। কিন্তু নিহতদের শোক ছুঁয়ে গেছে প্রায় সবাইকে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র - ইসরায়েলের হামলা শুরুর দিনেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মিনাব প্রসিকিউটর অফিসের হিসাবে, ওই ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত হন, তাদের মধ্যে ১২০ জন শিশু। এমনকি এই হামলার পাঁচ মাস পরও স্কুলটির ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল। সেখানেই উদ্ধার হয়েছে আট বছরের মাহিয়া সালারির খাতা। তার ছোট ভাই আলি এবং মাও ওই হামলায় নিহত হন। এখনও এক শিশুর দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নীচে থাকার আশঙ্কায় তল্লাশি চলছে।
মিনাবের স্কুলটি এখন আর স্কুল নেই। শুধু ভাঙা দেয়াল, ছড়িয়ে থাকা কংক্রিট আর স্মৃতি। সেখানে ছয় বছর শিক্ষকতা করা আমাইনে নাদেমি জানিয়েছেন যে, হামলার পর বাবা-মায়েরা খালি পায়ে সন্তানদের খুঁজতে ছুটে এসেছিলেন। তাঁদের অনেকেই আর সন্তানকে ফিরে পাননি। শহরের দোকান, রাস্তার ধারে এবং দেয়ালে এখন নিহত শিশুদের ছবি ঝুলছে।
এই যুদ্ধের অন্য এক ছবি দেখা যায় তেহরান থেকে বান্দার আব্বাসগামী প্রায় ১,৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রাতের ট্রেনে। ট্রেনের কামরায় ছাত্র, ব্যবসায়ী, পরিবার এবং ফুটবলার - সাধারণ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ। কিন্তু রাজনীতি নিয়ে কথা উঠতেই অনেকের কণ্ঠ থেমে যায়। আইনজীবী আজাদেহ যুদ্ধের আগে ছড়িয়ে পড়া সরকার বিরোধী বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তাঁর সহযাত্রী সেপিদেহ অবশ্য বলেন যে,তিনি ইরানকে ভালোবাসেন কিন্তু নিজের যৌবন ও স্বপ্ন হারিয়ে যেতে দেখে দেশ ছাড়ার কথাও ভাবছেন।
এর আগে ২০২৬ সালের গোড়ায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা সহ জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে ইরানে যে বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল। সেই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের অভিযোগও ওঠে। ফলে যুদ্ধ
শুরু হওয়ার পর দেশের মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান আরও জটিল হয়ে যায়। কেউ মনে করেন বাইরের হামলা ইরানিদের এক করেছে। আবার কেউ মনে করেন যুদ্ধকে ব্যবহার করে সরকারের দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে। আবার এই যুদ্ধের
স্মৃতি তরুণ ফুটবলারদের কাছেও ভিন্ন নয়। ঘরোয়া লিগ কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ফের শুরু হলে তারা ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলেন। তাদের একজন আবদুল্লাহ বলেন যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে শিশুদের স্কুলে হামলার কথা এবং সেই শিশুদের শেষকৃত্যে গোটা দেশের কান্নার কথাও।
বান্দার আব্বাসে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলির একটিতে যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতির ওপরও পড়েছে । হরমুজ প্রণালীর কাছে এই শহরটি ইরানের নৌবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি। ফলে যুদ্ধের সময় সেখানে ও আশপাশে বহু হামলা হয়েছে। বন্দর দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বহু জেলে আয় হারিয়েছেন। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ যায়। আর তেহরানে যুদ্ধের আরেক ভিন্ন ছবি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে বিপুল জনসমাগম হয়। রাস্তায় শোনা যায় আমেরিকা ও ইজরায়েল বিরোধী স্লোগান। সরকারের বিরোধিতা করা কিছু মানুষও সেদিন মিছিলে যোগ দেন। কিন্তু সেই দৃশ্যকেও পুরো দেশের মতামতের প্রতিচ্ছবি বলা কঠিন। ইরানের পথে পথে তাই একই যুদ্ধের একাধিক গল্প। মিনাবে তা হারানো সন্তানের স্মৃতি, বান্দার আব্বাসে জীবিকা হারানোর ভয়, ট্রেনে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং তেহরানে জাতীয়তাবাদের উত্থান। আসলে যুদ্ধ একটি দেশের মানুষের কাছে কখনও ঐক্যের গল্প, কখনও নিপীড়নের, আবার কখনও শুধুই হারিয়ে যাওয়া আপনজনের শোক।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




