যুদ্ধের আগুনে সবচেয়ে অসহায় অভিবাসী শ্রমিকরা

ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাবে অভিবাসী শ্রমিকরা এমন এক সংকটের মুখে পড়েছেন
যাদের ঘামে তৈরি হয় ঝকঝকে শহর, যাদের হাতে চলে বন্দর, বিমানবন্দর, নির্মাণকাজ, হোটেল, পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা–যুদ্ধ শুরু হলে সেই মানুষগুলোর নামই অনেক সময় হারিয়ে যায় পরিসংখ্যানের ভিড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের সবচেয়ে নীরব শিকার হয়ে উঠেছেন এশিয়ার লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। তারা গালফ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, কিন্তু যুদ্ধের সময়ে তাদের নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও ফিরে যাওয়ার পথই সবচেয়ে অনিশ্চিত।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাবে অভিবাসী শ্রমিকরা এমন এক সংকটের মুখে পড়েছেন, যেখানে তাদের সামনে একদিকে রয়েছে প্রাণের ঝুঁকি, অন্যদিকে রয়েছে জীবিকা হারানোর ভয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলার পর নিহতদের মধ্যে প্রথম দিকেই ছিলেন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের তিন অভিবাসী শ্রমিক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ২৬৮ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। কেউ সরাসরি হামলায়, কেউ আবার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষে প্রাণ হারান।
তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন কোনও একক সরকারি তালিকা নেই, যেখানে নিহত বা আহত ব্যক্তিদের জাতীয়তা, পেশা ও অভিবাসন অবস্থার বিস্তারিত তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে অনেক শ্রমিকের মৃত্যু বা ক্ষতির ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশে জনসংখ্যার বড় অংশই অভিবাসী। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকরা সেখানে নির্মাণ, বন্দর, বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, হোটেল, লজিস্টিকস ও শিল্প খাতে কাজ করেন। অথচ সংঘাতের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যুদ্ধের সময় অনেক শ্রমিক চাইলেও সহজে দেশে ফিরতে পারেন না। কারণ গালফে কাজ করতে যাওয়ার জন্য অনেকেই ঋণ নিয়ে নিয়োগ ফি, ভ্রমণ খরচ ও অন্যান্য ব্যয় বহন করেন। হঠাৎ দেশে ফিরে গেলে তাঁদের আয় বন্ধ হয়, কিন্তু ঋণের বোঝা থেকে যায়। ফলে অনেকের কাছে যুদ্ধের মধ্যে থাকা আর দেশে ফিরে আর্থিক ধ্বংসের মুখে পড়া, এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শ্রমিক অধিকারকর্মীদের মতে, বর্তমান শ্রম সুরক্ষা ব্যবস্থা মূলত স্বাভাবিক সময়ের দুর্ঘটনা বা কর্মক্ষেত্রের সমস্যার জন্য তৈরি। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, দীর্ঘ সময় বিমান চলাচল বন্ধ থাকা, জরুরি সরিয়ে নেওয়া বা যুদ্ধকালীন আয় বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশসহ শ্রমিক পাঠানো দেশগুলো কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মৃত শ্রমিকদের মরদেহ দেশে ফেরানো এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারি বিমা ব্যবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সুবিধা পেতে প্রয়োজন সঠিক নিবন্ধন ও কাগজপত্র। অনিবন্ধিত শ্রমিকরা অনেক সময় এসব সহায়তার বাইরে থেকে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের জন্য আগাম নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিয়োগকর্তাদের জরুরি তথ্য সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়ে সমান প্রবেশাধিকার, পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্রের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং সংঘাতের কারণে কাজ বন্ধ থাকলে আয় সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এশিয়ার শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর যেমন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সমন্বিত অবস্থান নেওয়া জরুরি। কারণ এককভাবে আলোচনার চেয়ে সম্মিলিতভাবে শ্রমিক সুরক্ষার দাবি তুললে তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সাধারণত তেল, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির আলোচনায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু সেই যুদ্ধের আরেকটি মুখ রয়েছে যেখানে রয়েছেন লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। তাঁরা যুদ্ধ শুরু করেন না, সিদ্ধান্ত নেন না; তবু যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন মূল্য অনেক সময় তাঁদেরই দিতে হয়।



