কেন হুতি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব
- নিহত ১২ জনের দুজন বাংলাদেশি

সামরিক পোশাক পরে, নকল ক্ষেপণাস্ত্র হাতে হুতি গোষ্ঠীকে সমর্থন এক ইয়েমেনির । ছবি: রয়টার্স
মরুর আঞ্চলিক ঝড়ের গোলকধাঁধায় এবার খেই হারিয়ে ফেলেছে খোদ ‘মধ্যপ্রাচ্যের মোড়ল’ সৌদি আরবও। মার্কিন পেট্রডলারের অহংকারে মোড়ানো অত্যাধুনিক ফাইটার জেট, প্যাট্রিয়ট মিসাইল আর বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দেশটির রাজকীয় বাহিনী আজ এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটে। বিলাসি রাজ প্রাসাদের আয়েশের ঘুম হারাম! কয়েক সপ্তাহের ঝোড়ো বিমান হামলাতেই ধুলোয় মিশে যাবে ইয়েমেনের রুক্ষ পাহাড়ের কাঠখোট্টারা (হুতি বিদ্রোহী)— সে হিসাব আজ পাল্টে গেছে! হাওয়ায় উড়ে গেছে রিয়াদের শাসকদের সেই আকাশচুম্বী অহংকার। তেলখনির বিপুল বৈভব আর আধুনিক সমরাস্ত্রের পাহাড় নিয়েও হুতিদের ড্রোন, চোরাগোপ্তা হামলার ভেলকি ধরতে পারছে না এই মরুভূমির নায়ক! নীরব এ জিজ্ঞাসাটিই এখন সমকালের আধুনিক সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
ইরানের আঁচল-পুত্র ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী আর যুক্তরাষ্ট্রের এটিএমবুথ সৌদি অারবের শত্রুতা বহুদিনের। প্রায় ১৭ বছরের পুরনো। শুরুটা ২০০৯ সালে, নভেম্বরে। সেবারও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিল হুতিরা। দখল করে নিয়েছিল সীমান্তে অবস্থিত দুই দেশের কৌশলগত পাহাড়ি অঞ্চল জাবাল-আল দুখান। সেসময়ও এই একই অভিযোগ-ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে মদদ। সেই থেকেই চলছে। কখনো সন্ধি, পরক্ষণেই যুদ্ধ। বুট-বুলেটের সেই চেনা পথেই চলতি বছরের জুলাই মাসে আবার নতুন দফার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সৌদি আরবের ওপর জলপথ অবরোধ আরোপ করে হুতিরা। অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে লোহিতসাগরের বাব আল মান্দেব প্রণালিতে। পরে আরও চরম আকার ধারণ করে সেপ্টেম্বরে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনার পটভূমিতে ১৮-১৯ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি বড় ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে হুতিরা। তারও সপ্তাহ আগে ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জ্বালানি স্পর্শকাতর রুট লোহিতসাগরের বাব আল মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নিতে বন্দরনগরী মোখার দখল নেয় হুতিরা। সেই থেকেই চলছে। পাল্টা একশ বিমান নিয়ে একসঙ্গে হামলা চালিয়েও বশে আনতে পারছে না সৌদি জোট। উল্টো ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় লোহিতসাগরের উপকূলবর্তী এলাকাগুলো। ৫ অক্টোবর অবশ্য সৌদি বিমান বাহিনীর সহায়তায় ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানে বাব আল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দাবি করেছে ইয়েমেন বাহিনী। কিন্তু ঘোষণা পর্যন্তই; ফলাফল দেখা যায়নি।
পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা সস্তা স্যান্ডেল পরা হুতি বাহিনীর নামমাত্র মূল্যের ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধসে পড়ছে সৌদির আধুনিক প্রযুক্তির সব রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সামরিক শক্তি, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তা— সবকিছুর পরও কীভাবে রিয়াদের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে হুতিরা? গতকাল রবিবারও নতুন করে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এতে বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে আগুন ধরে যায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ঠিক আগের দিনই এই একই বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা চালায় হুতিরা। এতে দুই বাংলাদেশিসহ নিহত হন ১২ জন। আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। এর আগেও ৬ ও ৭ অক্টোবর আবহা ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা চালায় হুতিগোষ্ঠী। এতে তিনজনের প্রাণ যায়। আহত হন ৩৬ জন। বিস্ময়ের বিষয় হলো, কোনো হামলাই এ পর্যন্ত প্রতিরোধ করতে পারেনি সৌদি আরব! রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পরপরই হুতি আস্তানায় পাল্টা হামলার কড়া জবাব দিয়েছে সৌদি জোট, যা কার্যত আমলে নেয়নি হুতিরা! উল্টো মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের অন্য বিমানবন্দর ব্যবহারে সতর্কতা জারি করেছে হুতি বাহিনী। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া। অথচ গত ৫ অক্টোবর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করেছে সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক জোট। যার অর্থ হলো, এক দেশ আক্রান্ত হওয়ার মানে হলো তিন দেশেই হামলা। ৮ অক্টোবর আবহা ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর কার্যকর করেছে সেই চুক্তিও। যার অধীনে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা সক্রিয় করেছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। সৌদিকে প্রতিরক্ষা সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা কয়েকটি মিত্রও। কিন্তু দিনশেষে সব জলে! উপরন্তু গতকাল নতুন এক বিবৃতিতে হুতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে আরও শক্তিশালী পাল্টা জবাব দেওয়া হতে পারে। দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স।
অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও ঝুঁকি কেন?
হুতির হামলা ঠেকাতে না পারার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। প্রথমত, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। সৌদি আরব মূলত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার মতো উচ্চ প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থাগুলো বড় আকারের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমান ধ্বংস করতে কার্যকর। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিরা অত্যন্ত সস্তা, ছোট এবং নিচু দিয়ে উড়ে আসা আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে। রাডারে এগুলো সহজে ধরা পড়ে না, ফলে বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখানে ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনার ভুল কৌশল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সামরিক বাহিনীকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করার চেয়ে পশ্চিমাদের থেকে বিপুল অস্ত্র ও বিদেশি সেনা ‘ক্রয়’ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে।
সহযোগীদের সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক স্বার্থ
মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন। রিয়াদের অনুরোধ সত্ত্বেও সরাসরি বিমান হামলা না চালিয়ে শুধু সীমিত গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে নিজস্ব কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে চাচ্ছে না পাকিস্তানও। ৭ আগস্ট সই হওয়া ‘মক্কা চুক্তি’ অনুযায়ী পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও তারা মূলত সৌদির সীমান্ত পাহারা ও আকাশ প্রতিরক্ষায় নজরদারি করছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও গেরিলা কৌশল
হুতিরা ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে আক্রমণ পরিচালনা করে। প্রথাগত সেনাবাহিনী বা বিমান হামলা চালিয়ে এ ধরনের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। নেপথ্যে রয়েছে ইরান সমর্থন। তেহরানের নিখুঁত জিপিএস গাইডেড ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌদির তেল শোধনাগার এবং বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
২ বাংলাদেশি নিহত, ৪ জন আইসিইউতে
রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। এ ঘটনায় আহত আরও চার বাংলাদেশি রিয়াদের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহতসহ চারজন আহত হয়েছেন, তারা সৌদির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। আমরা সবার পরিচয় নিশ্চিতে চেষ্টা করছি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আগেও যখন হুতিরা আক্রমণ করেছিল, তখন কিন্তু বাংলাদেশের একজন নিহত হয়েছিলেন। এখন দুজন নিহত হলেন। তাদের পরিচয়ও নিশ্চিত করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। একজন বগুড়ার শাজাহানপুরের মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. শাহেদ আহম্মেদ। অন্যজন কুমিল্লার লাঙ্গলকোটের মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী।



