ইয়েমেনে হুতিদের কারাগারে সৌদি জোটের হামলা, নিহত বেড়ে ২৩

সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের আল-ওয়াদিয়াহ ক্রসিংয়ের কাছে সৌদি ভূখণ্ড থেকে আসা ট্রাকে হামলার পর একটি জ্বলন্ত ট্রাক থেকে ধোঁয়া উঠছে- রয়টার্স
ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত একটি কারাগারে বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আবারও হামলা জোরদার করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সোমবার উত্তর ইয়েমেনের আল-জাওফ প্রদেশের কৌশলগত শহর হাজমে হামলার সময় কারাগারটি ধ্বংস হয়ে যায়। হুতিদের দাবি, ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর কারাগারটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো চলছে উদ্ধারকাজ। এর পাল্টা জবাবে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরব এবং ইরানের মদদপুষ্ট হুতিদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে এই ঘটনা বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাতে এমনিতেই অস্থিতিশীল হয়ে আছে অঞ্চলটি। এর মধ্যে সর্বশেষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিয়েছে।
জাওফের সিভিল ডিফেন্স সংস্থার পরিচালক হাসান সাবুলা বলেছেন, নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া নিখোঁজ সাতজনের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে।
নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি বলে সাবুলার বরাত দিয়ে জানিয়েছে আল-মাসিরাহ স্যাটেলাইট নিউজ চ্যানেল। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আল-আসবাহি জানান, হামলায় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন, যিনি তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে গিয়েছিলেন।
এক বিবৃতিতে বুধবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, কারাগারে হামলাটি সৌদি আরবের একটি এফ-১৫-এসএ যুদ্ধবিমান থেকে চালানো হয়েছে।
তিনি বলেছেন, বিমানটি সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। কারাগারে হামলা চালানোর পর ১৫ মিনিটের মধ্যে সেটি আবার ঘাঁটিতে ফিরে যায়।
এদিকে বুধবার ভোরে সৌদি জোটটি মারিব ও জাওফ প্রদেশে হুতিদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় হুতিরা উত্তরাঞ্চলের নিজেদের শক্ত ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলে পালিয়ে যায় এবং পরে সৌদি আরবে নির্বাসনে চলে যায়। সরকারকে পুনর্বহাল করার লক্ষ্যে পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইয়েমেন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে অন্তত দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেশটি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তেও পৌঁছেছে।
হুতিরা তেহরান থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি বিমান পাঠানোর চেষ্টা করার পর বিদ্রোহী ও জোটের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। গত জুলাইয়ে এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে হুতিরা জোটের প্রায় এক দশক ধরে চলা আকাশ ও নৌ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। জবাবে জোট ইয়েমেনি বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালিয়ে বিমানটির অবতরণ ঠেকিয়ে দেয়।
এরপর থেকে হুথিরা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজেও হামলা করেছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হুতিরা সৌদির কয়েকটি তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালায়। এর পর কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর ওপরও হুতিরা হামলা চালিয়ে আসছে। তবে চলতি মাসের শুরুতে সরকারি বাহিনী পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারা লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ২৩ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই সহিংসতায় অন্তত ১৯৪ জন নিহত এবং ৮৮০ জনের বেশি আহত হয়েছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এ সময়ে ২১ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এই সহিংসতায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়েছে। ওই যুদ্ধবিরতির কারণে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে লড়াই অনেকটাই বন্ধ ছিল।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস






