ব্যবসা থেকে সমুদ্রতল
রুশ ‘ছায়াযুদ্ধে’ বছরে ২৫০ কোটি পাউন্ড ক্ষতি ব্রিটেনের

যুদ্ধের জন্য সব সময় সীমান্তে ট্যাংক লাগে না, আকাশে যুদ্ধবিমানও নয়। কখনও যুদ্ধ ঢুকে পড়ে একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবস্থায়, কখনও সমুদ্রের তলায় যোগাযোগের তারে, কখনও ব্যবসার হিসাবের খাতায়। নতুন এক প্রতিবেদনের দাবি, রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন বৈরী তৎপরতার মূল্য দিতে গিয়ে ব্রিটেনের বছরে ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ লেবার পার্টির সংসদ সদস্য গ্রেম ডাউনির তৈরি নতুন গবেষণায় এ হিসাব উঠে এসেছে। সর্বদলীয় পুনঃসশস্ত্রীকরণ সংসদীয় গোষ্ঠীর সহসভাপতি ডাউনি তার প্রতিবেদনের নাম দিয়েছেন ‘পুতিন কর’। তবে এটি ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাব নয়।
গবেষণায় ২০২২ সালের পর বড় ধরনের রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত ঘটনায় বছরে গড়ে ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি পাউন্ড ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার, রয়্যাল মেইল এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সরবরাহকারীদের ওপর হামলার ঘটনাও রাখা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার হামলায় আরও ১৪৭ কোটি পাউন্ড এবং সমুদ্রতলের যোগাযোগ তার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ক্ষতিতে ২৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে প্রতিবেদনটি।
ডাউনির দাবি, প্রকৃত ক্ষতি এই হিসাবের চেয়েও “অনেক বেশি” হতে পারে। কারণ সরকারের প্রকাশিত তথ্য অসম্পূর্ণ এবং বহু বড় ঘটনার আর্থিক ক্ষতির নির্দিষ্ট হিসাবই নেই। তার বক্তব্য, হুমকি ও তার মূল্য সম্পর্কে জনগণের কাছে সত্য পরিষ্কার না করলে রাশিয়া বা অন্য কোনো প্রতিপক্ষকে কার্যকরভাবে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রের বৈরী তৎপরতায় অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা মাপার কোনো ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ সরকারি কাঠামো ব্রিটেনে নেই। অথচ প্রতারণা, অর্থনৈতিক অপরাধ কিংবা বন্যার ক্ষতি নিয়মিত হিসাব করা হয়।
এ কারণে প্রতি বছর সংসদের সামনে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর বৈরী তৎপরতার সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য প্রকাশের সুপারিশ করেছেন ডাউনি। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রকেও বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুক্ত সাইবার হামলার বার্ষিক মূল্যায়ন প্রকাশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাবেক ন্যাটো মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন অবশ্য ‘সংকর যুদ্ধ’ শব্দটিই পছন্দ করেন না। তার কথা, “এটা যুদ্ধ। তাহলে একে অন্য কিছু বলে ডাকা হবে কেন?” সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্নেহাল আন্তানি বলেছেন, এমন হামলা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের সীমা না পেরিয়েও “বাস্তব অর্থনৈতিক যন্ত্রণা” সৃষ্টি করছে।
ব্রিটিশ সরকার বলেছে, রাশিয়ার ধারাবাহিক বৈরী তৎপরতা “গুরুতর এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য”। সরকার রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বহিষ্কার, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা, অবৈধ অর্থের নেটওয়ার্ক দমন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে।
ব্রিটেনের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধঘোষণা নেই। তবু যদি কারখানা থামে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যোগাযোগব্যবস্থা বিপন্ন হয় এবং তার বিল শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়, তবে প্রশ্নটি আর শুধু নিরাপত্তার থাকে না। অদৃশ্য যুদ্ধেরও যে দাম আছে, নতুন এই হিসাব সেই মূল্যটিই সংখ্যায় লিখে দিল।এখানে ২৫০ কোটি পাউন্ডকে নিশ্চিত সরকারি ক্ষতির অঙ্ক হিসেবে লেখা হয়নি। এটি ডাউনির প্রতিবেদনের সর্বোচ্চ অনুমান, আর গবেষক নিজেই বলেছেন তথ্যের ঘাটতির কারণে প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে।



