ইরান যুদ্ধ
জর্ডানের পেত্রা নগরী এখন প্রায় ফাঁকা

জর্ডানের প্রাচীন নাবাতিয়ান নগরী পেত্রার ধ্বংসাবশেষে অবস্থিত ট্রেজারি পরিদর্শন করছেন পর্যটকেরা
জর্ডানের প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরী পেত্রা। গোলাপি পাথরে খোদাই করা এই নগরী একসময় মুখর থাকত পর্যটকের কোলাহলে। এখন সেখানেই বইছে নীরবতার হাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জর্ডানের পর্যটন খাতে। যুদ্ধের আতঙ্কে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে মুখ বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা।
পেত্রার বিশাল পাথুরে স্থাপনার সামনে সামনে এখন শুধু কজন বিরল পর্যটক। আর হতাশায় জবুথবু স্মৃতিচিহ্ন বিক্রেতারা। সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ইউক্রেনীয় পর্যটক রুসলানা নোভাক ও তার এক বন্ধু।
পেশায় বীমা এজেন্ট রুসলানা নোভাক বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধের খবর শুনেছি। কিন্তু যুদ্ধ আমাদের জন্য সমস্যা নয়, কারণ আমরা ইউক্রেন থেকে এসেছি। যুদ্ধ কী আমরা জানি।’
তিনি বলেছেন, জর্ডানের চারপাশে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থাকলেও দেশটি খুব শান্ত। এটি নিরাপদ ও সুন্দর।
পেত্রার প্রবেশমুখে স্মৃতিচিহ্ন পণ্য বিক্রেতা খালিদ আল-সাইদাত ও তার সহকর্মীরা অলস সময় কাটাচ্ছিলেন দোকানের সামনে। পর্যটক বহনে ব্যবহৃত গাধা ও ঘোড়াগুলোও দাঁড়িয়ে ছিল নিষ্ক্রিয় অবস্থায়।
খালিদ বলেছেন, এ দৃশ্য জর্ডানের পর্যটন খাতের পতনের প্রতিচ্ছবি। গাজা যুদ্ধের পর পর্যটন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। আর ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিদেশি পর্যটক প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
তার ভাষায়, ‘প্রতিদিন দোকান খুলছি। কিন্তু জানি না আদৌ সংসার চালানোর মতো আয় হবে কি না।’
সরকারি তথ্যমতে, জর্ডানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৪ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। এ খাতে সরাসরি কাজ করেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। আরও প্রায় তিন লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। গত বছর সাত মিলিয়নের বেশি পর্যটক দেশটিতে ভ্রমণ করে। যা থেকে আয় হয়েছিল ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
পেত্রা ছাড়াও জর্ডানে রয়েছে ওয়াদি রামের মরুভূমি, মৃত সাগর এবং ঐতিহাসিক জেরাশ নগরীর মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
পেত্রা পর্যটন কর্তৃপক্ষের বোর্ড চেয়ারম্যান আদনান আল-সাওয়াইর বলেছেন, ‘বছরের শুরুটা বেশ ভালো ছিল। প্রথম দুই মাসে ১ লাখ ১২ হাজার বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন। যা খুবই ইতিবাচক ছিল।’
তবে তিনি আরও বলেছেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবকিছু বদলে গেছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে পেত্রায় পর্যটকের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ থেকে ৩০ হাজারে।’
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে কিছু হোটেল বন্ধ করার কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ।
দেশীয় পর্যটন বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিলেও তার প্রভাব খুবই নগণ্য বলে মন্তব্য করেন সাওয়াইর।
তার মতে, জর্ডানের পর্যটন খাত মূলত বিদেশি ট্যুর গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জর্ডানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও পড়েছে। যদিও দেশটিতে কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নেই। তবুও প্রতিরক্ষা ও সহযোগিতা চুক্তির আওতায় কয়েকটি দেশের সীমিত সেনা উপস্থিতি রয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু থেকে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত ইরানের ছোড়া ২৮১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল, যার বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়।
যুদ্ধের আগে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বুকিং ক্যালেন্ডার প্রায় পূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছে জাতীয় ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর মুহূর্তেই সব বুকিং বাতিল হয়ে যায়। ফলে সংকটে পড়েছেন ১ হাজার ৪০০ লাইসেন্সধারী ট্যুর গাইড।
ক্রেতাশূন্য অবস্থায় স্মারকপণ্য বিক্রেতা ইব্রাহিম আল-আতমেহ প্রতিদিনের চেয়ে আগেই দোকান গুটিয়ে নিচ্ছেন।
৩১ বছর বয়সী এই বিক্রেতা বলেছেন, আমরা দারুণ একটি বসন্তকালীন পর্যটন মৌসুমের আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন সেই সব আশা শেষ হয়ে গেছে।
সূত্র: আলজাজিরা











