মধ্যপ্রাচ্য থেকে পিছু হটছে যুক্তরাষ্ট্র?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই বদলে দিচ্ছে না, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্রকেও। যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও গোয়েন্দা সদস্যের স্থায়ী উপস্থিতি কমানো এবং সামরিক ঘাঁটির কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বড় একটি অংশ পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এটিকে তাৎক্ষণিক সেনা প্রত্যাহার হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পরিবর্তে ছোট, অধিক সুরক্ষিত এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী কাঠামোর দিকে যাওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ দেখিয়ে দিল ঘাঁটির দুর্বলতা: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি আধুনিক যুদ্ধের যুগে একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
আগস্টে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, যুদ্ধ শেষ হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর সম্ভাবনা পেন্টাগন মূল্যায়ন করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো আগের মতো পুনর্নির্মাণ করা হবে, নাকি নতুন কৌশলে সামরিক অবকাঠামো সাজানো হবে— তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে।
সম্ভাব্য নতুন কৌশলের মূল ধারণা হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা ও বড় স্থায়ী ঘাঁটি রাখার পরিবর্তে সীমিত সেনা, উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার অস্ত্র এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী রাখা।
প্রায় ৫০ হাজার সেনার ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। ইরান যুদ্ধের সময় যুদ্ধজাহাজ, বিমান, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে একই সময়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর আলোচনা এবং কিছু মোতায়েন ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর খবর সামনে এসেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি সামরিক মোতায়েনের মেয়াদ বাড়িয়েছেন।
হরমুজ প্রণালিতে বড় পরীক্ষা: মার্কিন উপস্থিতি কমানোর যেকোনো পরিকল্পনার সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কেন্দ্রেও রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। ফলে সেনা কমালেও আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌশক্তি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়োজন থাকবে।
বদলে যেতে পারে ২৫ বছরের সমীকরণ: ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর যে সামরিক কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সেটিকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাওয়ার বদলে মধ্যপ্রাচ্যে তার থাকার ধরন বদলাতে পারে। বড় ঘাঁটি ও বিপুলসংখ্যক সেনার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর, নমনীয় ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক কাঠামোই হতে পারে ওয়াশিংটনের নতুন কৌশল।
ইরান যুদ্ধ তাই শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫ বছরের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
মিত্রদের ওপর বাড়বে চাপ: মার্কিন সেনা ও ঘাঁটির সংখ্যা কমলে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হতে পারে। বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় তাদের বিনিয়োগ বাড়বে।
তবে এখনই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়নি; বরং সম্ভাব্য পরিবর্তনটি হলো— কম স্থায়ী ঘাঁটি, সীমিত সেনা, উন্নত প্রযুক্তি এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনীর ওপর বেশি নির্ভরতা।





