অর্থের অভাবে ভেঙে পড়ছে বিশ্বের ত্রাণ ব্যবস্থা
ছোট হয়ে আসছে সাহায্যের হাত

ছবি: রয়টার্স
'মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য', ভূপেন হাজারিকার গানের সেই অমর কথাই যেন আজ এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে, দুর্ভিক্ষের ক্ষুধায়, বন্যার পানিতে আর ঘরহারা মানুষের চোখে আজও একই প্রশ্ন: একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?
যেখানে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বন্যা আর বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বাড়ছে, ঠিক সেখানেই ছোট হয়ে আসছে সাহায্যের হাত। বিশ্বের কোটি কোটি বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে যে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, অর্থের অভাব ও রাজনৈতিক সংকটে সেটিই এখন গভীর সংকটের মুখে। নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ২০২৫ সালে আগের তুলনায় ৬ কোটি ৪০ লাখ কম মানুষ মানবিক সাহায্য পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রয়োজন যখন সবচেয়ে বেশি, তখনই অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানো সাহায্যের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাকটিভ লার্নিং নেটওয়ার্ক ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড পারফরম্যান্স (এএলএনএপি)-এর নতুন রিপোর্টে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। ফলে যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় ও খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথাপিছু মানবিক সাহায্যের পরিমাণও দ্রুত কমেছে। ২০২১ সালে একজন মানুষের জন্য গড়ে যেখানে প্রায় ১৭৮ ডলার সহায়তা পৌঁছাত, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯০ ডলারে। অথচ একজন বিপন্ন মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৫ ডলারে। অর্থাৎ প্রয়োজন বাড়ছে, কিন্তু সহায়তার পরিমাণ কমছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যুদ্ধের কারণে ঘরছাড়া জনগোষ্ঠীর ওপর। ইয়েমেন, সুদান, গাজা, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন সংকটপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রয়োজন বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বড় দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তায় বড় কাটছাঁট করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মার্কিন অর্থায়ন প্রায় ৫৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দাতার মধ্যে ১৩টি দেশ তাদের সহায়তা কমিয়েছে।
শুধু অর্থের সংকট নয়, ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। এএলএনএপি-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার বড় অংশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও স্থানীয় সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী ও প্রবাসী নেটওয়ার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু রিপোর্টের সতর্কবার্তা—বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন না হলে বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন শুধু বেশি অর্থ নয়; প্রয়োজন সাহায্য পৌঁছানোর পদ্ধতিতেও পরিবর্তন। স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সরাসরি অর্থ দেওয়া, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে মানবিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন নতুন নতুন যুদ্ধ ও জলবায়ু বিপর্যয় মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে, তখন মানবিক সাহায্যের এই সংকট এক কঠিন প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে: বিপদের সময়ে যদি বিশ্বের হাতই ছোট হয়ে আসে, তবে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো কোথায় দাঁড়াবে?



