নিশানায় আমেরিকা, অশান্ত ইউরোপ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যুদ্ধ সবসময় কামানের গর্জনে আসে না। কখনো আসে অচেনা নম্বরের বার্তায়, কখনো মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাবে, কখনো রাতের আকাশে শব্দহীন ড্রোন হয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়াতে গড়াতে ইউরোপের নিরাপত্তা মানচিত্রে এখন এমনই এক অদৃশ্য রেখা ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ ঘোষিত নয়, অথচ হত্যার ছক, নাশকতা, নজরদারি আর আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে যাচ্ছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ অভিযোগ, রুশ গোয়েন্দা-সংযুক্ত একটি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোয় লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা ও হামলার পরিকল্পনা করছিল।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে প্রকাশিত অভিযোগপত্রে পাঁচজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ভাড়াটে খুনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে মার্কিন বিচার দপ্তর। অভিযুক্তরা হলেন রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্নেল ইউরি খ্রামেয়েভ, তার ছেলে ও রাশিয়ার এফএসবি কর্মকর্তা কিরিল খ্রামেয়েভ, কিউবার নাগরিক ওমিস রোমাগোজা দুরুথি, ইয়াইদেল দেলগাদো সুয়ারেজ এবং ভেনেজুয়েলার অ্যাঞ্জেল এদুয়ার্দো কাস্ত্রো। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, অন্তত ২০২৪ সাল থেকে এই তথাকথিত ‘আরআইএস নেটওয়ার্ক’ রুশ ভিন্নমতাবলম্বী এবং ইউক্রেনের মিত্র বলে বিবেচিত দেশগুলোকে লক্ষ্য করছিল।
প্রসিকিউটরদের দাবি, এ বছরের গ্রীষ্মে ওয়াশিংটনে বসবাস করছেন বলে ধারণা করা এক পরিচিত রুশ ভিন্নমতাবলম্বীর ওপর নজরদারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক ব্যক্তিকে ১ থেকে দেড় হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি ছবি ও ভিডিও পাঠানোর পর লক্ষ্যব্যক্তিকে ‘চিরতরে সরিয়ে দেওয়া’ বা ‘অদৃশ্য’ করাতে ৪০ হাজার ডলারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি খুনে রাজি হননি। এরপর অন্য কাউকে পাওয়া যায় কি না, তা জানতে চাওয়া হয়; সুয়ারেজ নাকি জানিয়েছিলেন, মেক্সিকোতেও তাদের লোক রয়েছে।
আরও পুরনো একটি পরিকল্পনার সূত্র যায় লিথুয়ানিয়ায়। বিচার দপ্তরের অভিযোগ, ২০২৫ সালে এক মার্কিন নাগরিককে ভিলনিয়াসে এক রুশ সমালোচকের ঠিকানার ছবি তুলতে ২০০ ডলার দেওয়া হয়েছিল। পরে ইউরি খ্রামেয়েভ ওই ব্যক্তিকে হত্যার জন্য প্রায় ২৫ হাজার ডলার প্রস্তাব করেন। অভিযোগপত্রে তার বক্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে, লক্ষ্যব্যক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ বলছেন এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। হত্যায় অস্বীকৃতি এলে গুদাম বা বিদ্যুৎ সাবস্টেশনে আগুন লাগানোর মতো ‘সহজ কাজের’ প্রস্তাব আসে। তদন্তকারীদের মতে, খ্রামেয়েভের বার্তা ছিল, ইউক্রেনকে সাহায্য করা দেশগুলোই লক্ষ্য।
এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ইউরোপে নাশকতার অভিযোগও রয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলেছে, দুরুথি ২০২৪ সালের জুনে প্রাগে এবং সেপ্টেম্বরে লিথুয়ানিয়ায় হামলার জন্য যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যবস্থা সমন্বয় করেছিলেন। পাঁচ অভিযুক্তই এখনো পলাতক। সন্ত্রাসে অর্থায়নের ষড়যন্ত্রে সর্বোচ্চ ২০ বছরের এবং ইউরি খ্রামেয়েভ, সুয়ারেজ ও কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ভাড়াটে খুনের ষড়যন্ত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা হতে পারে। তবে বিচার দপ্তর স্পষ্ট করেছে, এগুলো অভিযোগমাত্র; আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা নির্দোষ বলেই গণ্য হবেন।
আর সেই অভিযোগ সামনে আসার ঠিক সময়েই ইউরোপের আকাশ, সমুদ্র ও রেলপথে একের পর এক ঘটনা নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর লিথুয়ানিয়ার আকাশে বেলারুশের দিক থেকে ঢোকা বিস্ফোরকবাহী একটি ড্রোন ইতালীয় ন্যাটো যুদ্ধবিমান গুলি করে নামায়। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তোর বক্তব্য, ড্রোনটি ‘সম্ভবত’ রাশিয়া থেকে এসেছিল। একই সময়ে ডেনমার্ক জানায়, বাল্টিক সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ তাদের সামরিক হেলিকপ্টারের দিকে দুটি ফ্লেয়ার ছোড়ে; একটি হেলিকপ্টারটির খুব কাছ দিয়ে যায়। কোপেনহেগেন ঘটনাটিকে বিপজ্জনক বলে রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।
এ উত্তেজনার আরেক প্রতীক ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের রেলপথ। একটি রুশ ড্রোন যাত্রীবাহী ট্রেনে আঘাত হানার কিছু সময় আগেই সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ কয়েক জন বিদেশি প্রতিনিধি একই রুট ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে জানা যায়। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে আরও রুশ ‘উসকানি’র জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন। নিরাপত্তা-বিশ্লেষণের মূল উদ্বেগ এখানেই। তুলনামূলক সস্তা ড্রোন, অগ্নিসংযোগ বা অবকাঠামো নাশকতার মাধ্যমে সরাসরি বৃহৎ যুদ্ধে না গিয়েও প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সীমারেখা বারবার পরীক্ষা করা সম্ভব।
পোল্যান্ড বাল্টিক উপকূল থেকে সন্দেহভাজন রুশ ড্রোনও উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসে ৩০টিরও বেশি স্থানে রেললাইনে ইচ্ছাকৃতভাবে ধাতব বস্তু বসিয়ে ট্রেন চলাচল ব্যাহত করা হয়। কে বা কারা করেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়; ডাচ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে রেল অবকাঠামোয় নাশকতা হিসেবে তদন্ত করছে। ফলে প্রতিটি ঘটনাকে রাশিয়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো সব ক্ষেত্রে নেই, এ পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সিএনএনের বিশ্লেষণে এই ধারাবাহিক ঘটনাকে ইউরোপে ‘গ্রে-জোন’ সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হয়েছে, মানে এমন কর্মকাণ্ড, যা প্রকাশ্য যুদ্ধের সীমা অতিক্রম না করেও যুদ্ধকে আরও কাছে অনুভব করায়, প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সীমা পরীক্ষা করে এবং অনিশ্চয়তা বাড়ায়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনও ডেনমার্ক ও লিথুয়ানিয়ার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ইউরোপের প্রস্তুতি ও সংকল্প যাচাইয়ের বৃহত্তর রুশ তৎপরতার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন।
মস্কোর অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। ডেনমার্কে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির বারবিন অভিযোগ করেছেন, ড্যানিশ হেলিকপ্টারই রুশ যুদ্ধজাহাজের কাছে বিপজ্জনক ও উ সকানিমূলক আচরণ করেছিল। নতুন মার্কিন অভিযোগপত্র নিয়েও এফএসবি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি। অতীতেও মস্কো ইউরোপে নাশকতা ও গোপন হামলায় জড়িত থাকার বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।



