সুড়ঙ্গে আটকে পড়া নিয়ে নেপালি শ্রমিক, ‘আমার দায়িত্ব ছিল সবাইকে বাঁচানো’

শুক্রবার নুয়াকোটের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধারকারীরা সঞ্জয় সাহকে বের করে আনছেন। ছবি: নেপালি সেনাবাহিনী
নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ছিলেন অটল। ছেড়ে যাননি সহকর্মীদের। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে নিজেকেই ফেলেছিলেন বিপদে। নদী বেয়ে আসা ধ্বংসস্তূপসহ কাদামাটির চাপায় আটকে পড়েন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের গভীর সুড়ঙ্গে। সেখান থেকেই ‘অলৌকিকভাবে’ ৯দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে নেপালি শ্রমিক সঞ্জয় সাহকে।
আজ শুক্রবার সকালে নেপালের নুয়াকোটের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয়কে প্রথম উদ্ধার করা হয়। এরপর তিনি জানালেন সহকর্মীদের রক্ষায় তার দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতার কথা।
সকালে আরও একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি হচ্ছেন কবির মহার্জন। এ ছাড়া ওই সুড়ঙ্গ থেকে আটকে পড়া বাকিদের উদ্ধারে চলছে অভিযান।
সঞ্জয় উদ্ধারকারীদের বলেছেন, ‘দুর্ঘটনার পর অন্যরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে গেলেও তিনি সেখানেই থেকে যান। কারণ সবাইকে নিরাপদে বের করে আনার দায়িত্ব ছিল তারই।’
যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন সঞ্জয়। তিনি জানালেন, দুর্ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন তিনি ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে কর্মরত ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে না গিয়ে তিনি প্রথমে অন্যদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
কেন তিনি দ্রুত নিজেকে রক্ষায় সরে গেলেন না, নেপালের সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিমকে জানালেন সে বিষয়ে। বললেন, ‘আমার দায়িত্ব ছিল সবার জীবন বাঁচানো।’
দুর্ঘটনার শুরুর পর থেকেই সঞ্জয় অন্যদের দ্রুত সরে যেতে বলছিলেন। যখন অন্যরা চলে গেল তখন আর তিনি নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার সুযোগ পাননি। জানালেন, ‘সবাইকে সরে যেতে বলতে বলতে দেখি আমার যাওয়ার আর পথ রইল না। পরে আর কী, আটকে গেলাম।’
এই শ্রমিক কীভাবে এতদিন সুড়ঙ্গের মধ্যে ছিলেন তা বলতে গিয়ে বললেন, ‘উদ্ধারের অপেক্ষায় তিনি ভেতরে একটি মন্ত্র জপ করে সময় কাটিয়েছেন।’
ভেতরে কত লোক আটকে আছে জানতে চাইলে সঞ্জয় জানালেন, তিনি তার আশপাশে তিন-চারজনের কথা শুনেছেন বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।
তবে সুড়ঙ্গের গভীরে আরও লোক থাকতে পারে বলে মনে করছেন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের এ শ্রমিক। বললেন, এমনটা হতে পারে। সবাই হয়তো পালাতে পারেনি। সুড়ঙ্গটি অনেক লম্বা।
এদিকে উদ্ধার হওয়া অন্য শ্রমিক কবির মহার্জনের পরিবারে বইছে খুশির বন্যা। তার স্ত্রী হীরাশোভা বিবিসি নেপালকে জানিয়েছেন, তার স্বামীকে জীবিত খুঁজে পাওয়ায় তিনি কতটা খুশি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না।
‘আমরা ১০ দিন ধরে ঠিকমতো খেতে পারিনি। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। এখন আমরা সবাই খুশি। আমরা কাঁদছিও’, যোগ করেন হীরাশোভা।
কবির মহার্জনের ভাই আমির মহার্জন জানিয়েছেন, ‘আমার ভাইকে জীবিত পাওয়া গেছে এটা খুবই খুশির খবর। আমার এখন অনেক হালকা লাগছে। আমাদের পুরো পরিবার খুবই খুশি।’
উদ্ধারের পর তাদের হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেওয়া হয়ে।
নেপাল বিদ্যুৎ সংস্থার (এনইএ) কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, উদ্ধার শ্রমিকের হাত ও পায়ে আঘাত রয়েছে। সম্ভবত টানেলের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার কারণে তারা এ আঘাত পেয়ে থাকতে পারেন। তারা অক্সিজেনের অভাবে ভুগছেন।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুরেশ রাউত বিবিসিকে বলেছেন, তাদের ধারণা অনুযায়ী টানেলটির ভেতরে আরও ৩৯ শ্রমিক রয়েছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, বিভিন্ন বিদ্যুৎপ্রকল্পের সুড়ঙ্গে শত শত শ্রমিক আটকে আছেন।
ওই সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার হওয়া অন্য শ্রমিক হচ্ছেন— যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ।
রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির আইনপ্রণেতা ও প্রকৌশলী শ্রী রাম নেউপানে গত ২৬ আগস্ট বন্যা আঘাত হানার পর থেকে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত রয়েছেন। তিনি জানান, দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় টানেলের ভেতরে আটকে থাকা অন্যদেরও উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের বরাতে শ্রী রাম নেউপানে জানান, প্রথমে সঞ্জয় সাহকে উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধার করা হয় কবির মহার্জনকে।
এর আগে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতর থেকে মানুষের কথা শুনতে পান। এরপর সেখানে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
কথা শোনার পর নেপাল সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী তাদের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করে।
নেউপানে বলেছেন, ‘উদ্ধারকারী দল ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেছিল, আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’ ভেতর থেকে জবাব আসে, ‘ঠিক আছে।’
পরে তিনি জানিয়েছেন, টানেলের ভেতরে একাধিক ব্যক্তি আটকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উদ্ধারকারীরা।
২৬ আগস্ট আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা প্লাবিত হয়। এতে নেপালে ১ হাজার ২৫২ জন নিহত হন। এ ছাড়া চীনের তিব্বতে নিহত হন ২১ জন। বন্যায় নেপালে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। এরপর থেকে দুর্গম পরিস্থিতির মধ্যেই টানেল ও বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।








