লুলা-বলসোনারো লড়াইয়ে ঝুঁকিতে অভিবাসীরা?

ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শেষে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সমীকরণ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলে প্রথম দফায় এগিয়ে রয়েছেন জেইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ফ্লাভিও ৪৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ (৫৬ দশমিক ১ মিলিয়ন) ভোট পেয়ে প্রথম স্থানে রয়েছেন, আর লুলা পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ (৫৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন) ভোট। আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার এই তীব্র লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের প্রবাসী ও অভিবাসীদের মধ্যে এখন চরম শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর প্রধান দুই প্রার্থী জাতীয় গণমাধ্যম ও সংবাদ সম্মেলনে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও অভিবাসনসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছেন। প্রথম দফায় নাটকীয়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার পর ফ্লাভিও বলসোনারো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ঘোষণা করেছেন, এই রায় ব্রাজিলের রাজনীতিতে ‘পিটি যুগের অবসান’ ঘটিয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ও তার শিবির স্পষ্ট করে দিয়েছে, কংগ্রেসে তাদের যে রক্ষণশীল মিত্ররা রয়েছে (যারা পিএল ২৫২৩-এর মতো কঠোর অভিবাসন ও নাগরিকত্ব বিলের প্রবক্তা), তাদের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়মে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। অভিবাসনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার দিন শেষ— এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে সামান্য ব্যবধানে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলা শিবির দ্রুত কৌশল বদল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রেস ব্রিফিংয়ে লুলা তার সমর্থকদের উদ্দেশে নতুন ‘শক্তি ও উদ্দীপনা’ নিয়ে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, বলসোনারো শিবিরের বিজয় মানেই ব্রাজিলের ঐতিহাসিক উন্মুক্ত, একীকরণ ও মানবাধিকারভিত্তিক অভিবাসন নীতিগুলোর মারাত্মক সংকোচন। তবে তার নিজের আমলের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও, তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় নিজের পুরনো রাজনৈতিক অর্জনগুলোকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
ব্রাজিলের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি নির্ধারণ করবে দেশটিতে বসবাসরত লক্ষাধিক অভিবাসী ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ আইনি সুরক্ষা কতটা সংকুচিত হবে।
লুলার আমলের ধীরগতি:
লুলা প্রশাসনের অধীনে ব্রাজিল কাগজে-কলমে উদারনীতি বজায় রাখলেও বাস্তবে বৈধ অভিবাসনের পথ অত্যন্ত শ্লথ হয়ে পড়েছে। ফেডারেল পুলিশের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা, সিআরএনএম কার্ডের দীর্ঘসূত্রতা এবং নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য আবার ভিসা চালুর মতো বিষয়গুলো অভিবাসীদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
এদিকে কংগ্রেসে বিচারাধীন পিএল ২৫২৩/২০১৯ বিলটি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক বড় উদ্বেগের নাম। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে স্থায়ী বসবাসের সময় গণনা, কঠোর আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ এবং বিদেশের আইনি রেকর্ড যাচাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ প্রায় দুর্গম হয়ে উঠবে।
রানএফের পর অভিবাসীদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?: ব্রাজিলের সংবিধান জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষা দিলেও, নির্বাহী বিভাগের নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতা অভিবাসনের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে সরাসরি বদলে দিতে পারে। অভিবাসীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না; শুধু বিচার মন্ত্রণালয়, ফেডারেল পুলিশের নেতৃত্ব এবং ভিসানীতির কঠোর নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট।
যদি লুলা বিজয়ী হন:
দেশের আইনি কাঠামো ও জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার টিকে থাকবে, তবে বর্তমান আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, কাগজপত্রের কড়াকড়ি এবং ফেডারেল পুলিশের কড়া নজরদারি অপরিবর্তিত থাকবে।
যদি ফ্লাভিও বলসোনারো বিজয়ী হন: অভিবাসননীতিতে রক্ষণশীল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির বড় ধাক্কা আসতে পারে। পিএল ২৫২৩ বিলের মতো কঠোর আইনগুলোর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার নামে নাগরিকত্বের শর্ত কঠিন করার পথ উন্মুক্ত হবে।
ব্রাজিলের জাতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ বলছে— লুলা হতাশা আর বলসোনারো বিপদ— উভয়ক্ষেত্রেই অভিবাসীদের জন্য পথ খুব একটা সহজ নয়।



