পশ্চিমবঙ্গে থাকছে না মুসলিম আইন! চালু হচ্ছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি

ইউসিসি কার্যকর হলে সব ধর্ম, বর্ণ, জাতের মানুষের জন্য আইন হবে সমান- প্রতিনিধি
কলকাতায় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়ে বড় ঘোষণা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল শুক্রবার উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে সাংবাদিকদের তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি কার্যকর করা হবে। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আগামী সোমবার বিধানসভায় জানানো হবে।
শুভেন্দুর বক্তব্য, গুজরাট, আসাম ও উত্তরাখণ্ডের মতো পশ্চিমবঙ্গও আইনি প্রক্রিয়া মেনেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করবে। এ বিষয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। বিধানসভাতেই তার রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
বর্তমানে ইউসিসি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে সংখ্যালঘু সমাজে। কারণ, এই আইন কার্যকর হলে বিয়ে, বিয়েবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, দত্তক গ্রহণ, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক আলাদা ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একক আইন চালু হতে পারে। এখন মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, পারসিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এসব বিষয়ে পৃথক আইন রয়েছে। ইউসিসির মূল ধারণা হল, ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন কার্যকর করা।
এই কারণেই মুসলিম সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মুসলিম পারসোনাল ল’-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক, বিশেষ করে উত্তরাধিকার, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় রীতিনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন ও সমালোচকদের বক্তব্য, এত বড় সামাজিক পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। তাদের প্রশ্ন, এক আইনের ধারণা কাগজে সমতার কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা কি একই?
একই প্রশ্ন বামপন্থী শিবিরেও। তাদের বক্তব্য, নারী অধিকার ও সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা চাপিয়ে দিয়ে নয়, বরং আলোচনা ও ঐকমত্যের মাধ্যমে হওয়া উচিত। বাম নেতাদের মতে, ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে বহু সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। ফলে আইন সংস্কারের আগে ব্যাপক জনমত গঠন জরুরি।
ইউসিসি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আদিবাসী ও বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়। সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, পাহাড় ও জঙ্গলমহলের কিছু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান রাখা হতে পারে। তবে বিলের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি স্পষ্ট নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছে, অন্যান্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখেই রাজ্যের মডেল তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন বিধানসভার বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে ইউসিসি বিল আনার প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানায় সরকারি সূত্র। সেই সূত্র ধরেই আগামী সোমবার চলতি বাজেট অধিবেশনে বিলটি পেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায় ইউসিসি বিলের বিরোধিতা করে বললেন, এই আইনের প্রয়োজন নেই এবং বিজেপি সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবেই এই আইন আনতে চাইছে। এছাড়া তিনি মনে করিয়ে দেন, সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ বাধ্যতামূলক নয়। এছাড়াও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ইউসিসি মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তার দাবি, আদিবাসী ও কুড়মি সম্প্রদায়ের প্রথাগত অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।





