ন্যায়বিচারের খোঁজে রোহিত ভেমুলা থেকে জন্তর মন্তর

দশ বছর পরে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লির জন্তর মন্তরে আবারও তরুণদের ভিড়
প্রতিটি প্রজন্মেরই কিছু প্রশ্ন থাকে, যা সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না। বরং নতুন নতুন মুখ, নতুন নতুন ঘটনার মধ্যে দিয়ে সেই প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, ছাত্রাবাস, রাজপথ কিংবা জন্তর মন্তরের বিক্ষোভমঞ্চ—সবখানেই যেন গত এক দশক ধরে একটি প্রশ্নের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে: ন্যায়বিচার কোথায়?
২০১৬ সালে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুও সেই প্রশ্নকেই সামনে এনে দিয়েছিল। হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্রটির শেষ চিঠি কেবল একটি ব্যক্তিগত বেদনার দলিল ছিল না। তা হয়ে উঠেছিল বঞ্চনা, বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রজন্মের অভিযোগপত্র। সেই ঘটনার পর দেশের নানা প্রান্তে ছাত্র আন্দোলনের যে ঢেউ উঠেছিল, তার রেশ আজও মিলিয়ে যায়নি।
দশ বছর পরে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লির জন্তর মন্তরে আবারও তরুণদের ভিড়। এবার কেন্দ্রবিন্দুতে নীট পরীক্ষা এবং পরীক্ষা পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকেরা শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। তাদের বক্তব্য, পরীক্ষার অনিয়ম এবং অনিশ্চয়তার চাপে বহু পরীক্ষার্থীর জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
বিক্ষোভের ভাষা বদলেছে, পোস্টারের রং বদলেছে, কিন্তু দাবির মূল সুরটি যেন একই রয়ে গেছে। রোহিত ভেমুলার সময়ে যেমন প্রশ্ন ছিল মর্যাদা ও সমতার, আজ তেমনই প্রশ্ন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুযোগের ন্যায্য বণ্টন নিয়ে। এক দশকের ব্যবধানে ছাত্র রাজনীতির মানচিত্র বদলালেও ক্ষোভের উৎস অনেকটাই একই।
এই আন্দোলনগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতও নতুন নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সময় যে ভাষায় ছাত্রদের আক্রমণ করা হয়েছিল, আজও অনেক ক্ষেত্রে সেই একই অভিধা ফিরে আসে। ‘দেশবিরোধী’, ‘ষড়যন্ত্রকারী’ কিংবা ‘বিভাজনের রাজনীতি’ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে ঘিরে এমন অভিযোগ ভারতের জনজীবনে পরিচিত। অথচ ইতিহাস বলে, দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে ছাত্রসমাজের প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়েই।
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়; সেগুলো সমাজের বিবেকেরও আয়না। সেখানে জমে থাকা অসন্তোষ, আশা, হতাশা এবং স্বপ্ন অনেক সময় দেশের বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়। তরুণদের আন্দোলন সেই কারণেই কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
রোহিত ভেমুলার নাম আজও ভারতের ছাত্র-আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষতের মতো উচ্চারিত হয়। হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্র এবং আম্বেদকর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য রোহিত ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র রাজনীতি ও মতপ্রকাশকে কেন্দ্র করে বিতর্কের পর তাকে এবং আরও কয়েকজন দলিত ছাত্রকে হোস্টেল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ক্যাম্পাসের মধ্যেই তারা অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হন।
২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি কক্ষে রোহিতের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। মৃত্যুর আগে লেখা তার দীর্ঘ চিঠি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই চিঠিতে তিনি নিজের হতাশা, বঞ্চনা এবং মানুষের পরিচয়কে কেবল একটি সংখ্যা বা ভোটে পরিণত করার বিরুদ্ধে ক্ষোভের কথা লিখেছিলেন। রোহিতের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হয়। বহু ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল অভিযোগ তোলে যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক আচরণ তাঁকে চরম মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কও চলতে থাকে। তার মৃত্যু অনেক অসমাপ্ত প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল।
জন্তর মন্তরের বর্তমান আন্দোলনও সেই প্রশ্নগুলোরই নতুন সংস্করণ। হয়তো মুখ বদলাবে, সংগঠনের নাম বদলাবে, নতুন নতুন ইস্যু সামনে আসবে। কিন্তু যতদিন তরুণেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে, ততদিন প্রতিবাদের এই উত্তরাধিকারও বেঁচে থাকবে।
কারণ প্রতিবাদের সত্যিই বয়স হয় না। এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর থেমে গেলে, অন্য প্রজন্ম সেই সুরই আবার তুলে নেয়—আরও একবার, আরও জোরে।





