ডিজিটাল মিম থেকে রাজপথের লড়াই
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এবং ‘ভারতের জেন-জি’র ভবিষ্যৎ
- ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে একটি শক্তিশালী ‘প্রেসার গ্রুপ’ বা চাপ সৃষ্টিকারী দল হিসেবে

মিম দিয়ে ভাইরাল হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ছবি: সংগৃহীত
উনিশ শতকের কলকাতায় বাবু সংস্কৃতির ভণ্ডামি আর ঔপনিবেশিক সমাজের অসংগতিকে চাবুক মেরেছিল কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। ঠিক দেড়শো বছরেরও বেশি সময় পর, একবিংশ শতাব্দীর উঠোনে (২০২৬ সাল) এসে দিল্লির যন্তর মন্তরে যেন পুনর্জন্ম হলো সেই ‘হুতোম’-এর। তবে এবার আর প্যাঁচা নয়, প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে এক ডানাওয়ালা অনাকাঙ্ক্ষিত কীট — তেলাপোকা। সোশ্যাল মিডিয়ার মিম স্ক্রিন পেজ থেকে উঠে এসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আজ ভারতের ক্ষুব্ধ, শিক্ষিত ও বেকার জেন-জি’ প্রজন্মের এক অদ্ভুত, অবাস্তব কিন্তু তীব্র রাজনৈতিক হাতিয়ার।
১৫ মে ২০২৬ সালের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের গভীরতা কেবল একটি ব্যঙ্গ-রসিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই আজ। নিট-২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি একে রূপ দিয়েছে রাজপথের গণ-আন্দোলনে । কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মিম-ভিত্তিক ‘অ্যাবসার্ড’ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী? এটি কি ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমের মতোই দ্রুত হারিয়ে যাবে?
ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ব্যঙ্গাত্মক ও অহিংস চরিত্র। প্রথাগত রাজনৈতিক আন্দোলনে যেখানে রাষ্ট্র বা পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান কিংবা আইনি মামলার ভয় থাকে, সেখানে সিজেপি’ ব্যবহার করেছে হাস্যরসকে।
রাষ্ট্র যখন কোনো সিরিয়াস বা গুরুগম্ভীর সমালোচনাকে দেশদ্রোহী বা উগ্র তকমা দিয়ে দমন করতে চায়, তখন ‘আমি তো অলস, বেকার তেলাপোকা’ এই অদ্ভুত আত্মপরিচয়ের সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে তারা। হাস্যরসকে আইনি বা পুলিশি উপায়ে দমন করা কঠিন।
তেলাপোকা এমন এক জীব, যা পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা চরম প্রতিকূলতাতেও বেঁচে থাকে। এই বৈশিষ্ট্যকে নিজেদের জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে ভারতের জেন-জি তরুণরা। ২৯.১% শিক্ষিত বেকারত্বের হার, দুর্নীতি এবং প্রশ্ন ফাঁসের বাজারেও তারা যে টিকে আছে, এই টিকে থাকার জেদই আন্দোলনের জ্বালানি।
কোন পথে যাবে এই আন্দোলন? এই অভিনব আন্দোলনের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করলে মূলত তিনটি সম্ভাব্য দিক বা পরিণতি লক্ষ্য করা যায়:
১. ককরোচ জনতা পার্টি হয়তো কোনোদিন প্রথাগত নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার গঠন করবে না (যদিও তাদের ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা মূলধারার দলগুলোর চেয়েও বেশি)। তবে তাদের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে একটি শক্তিশালী ‘প্রেসার গ্রুপ’ বা চাপ সৃষ্টিকারী দল হিসেবে।
ভবিষ্যতে শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান, এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে সরকারকে বাধ্য করতে পারে তারা। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের দাবি-দাওয়াকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে সিজেপি একটি স্থায়ী নজরদারি দল (ওয়াচডগ) হয়ে উঠতে পারে।
২. ভারতের বিশাল তরুণ ভোটাররা দীর্ঘকাল ধরে জাতপাত, ধর্ম কিংবা প্রথাগত স্লোগানের রাজনীতিতে ক্লান্ত। সিজেপির ভবিষ্যৎ হলো, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোকে এটি বাধ্য করবে তাদের প্রচারণার ভাষা বদলাতে। ২০২৬ বা তার পরবর্তী সময়ে যেকোনো নির্বাচনে তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল অধিকারকে এজেন্ডার শীর্ষে রাখতে হবে। প্রশান্ত ভূষণের মতো আইনজীবীদের সমর্থন এই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়েছে।
৩. মিম সংস্কৃতির একটি বড় ত্রুটি হলো এর ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি। আজ যা ট্রেন্ডিং, এক মাস পর তা ‘বোরিং’ হয়ে যেতে পারে। নিট বিতর্কের উত্তাপ কমে গেলে বা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো কোনো তাৎক্ষণিক দাবি পূরণ হলে, এই তরুণরা কি একইভাবে রাস্তায় থাকবে? যদি আন্দোলনে কোনো সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে না ওঠে, তবে এটি কেবলই একটি ‘অনলাইন হাইপ’ হিসেবে থেকে যাবে ইতিহাসে।
দিল্লির যন্তর মন্তরের প্ল্যাকার্ডে যখন লেখা হয়, ‘নর্দমাও আমাদের বাসস্থান’ কিংবা ‘উন্নয়ন চাই, উচ্ছেদ নয়’- তখন বুঝতে হবে ব্যঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর নাগরিক সংকট। গম্ভীর স্লোগান ও রাজনৈতিক দলের পতাকা-মিম, প্লাকার্ড এবং ব্যঙ্গাত্মক গান (‘হ্যাঁ, ম্যাঁয় হুঁ ককরোচ’)। নির্দিষ্ট দলীয় মতাদর্শ- দলহীন, স্বতঃস্ফূর্ত জেন-জি ক্ষোভ ও হাস্যরস।
বিক্ষোভকারীরা যেভাবে ‘ককরোচ সমাজ’-এর অস্তিত্বের সংকটের কথা বলছেন, তা আসলে ভারতের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত তরুণদেরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে মেগা-সিটি ও বড় বড় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের সংকোচন, এই দুইয়ের মাঝখানের শূন্যস্থানটি পূরণ করেছে এই আন্দোলন। ককরোচ আন্দোলনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূলধারার রাজনীতির চতুরতা। ইতোমধ্যেই সমালোচকরা একে ‘বিরোধী দলগুলোর ছক’ বলে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সুপ্রিম কোর্টে সিবিআই তদন্তের আবেদনও হয়েছে। রাষ্ট্র যদি এই আন্দোলনকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তবে নষ্ট হবে এর স্বকীয়তা।
তাছাড়া, মাত্র ‘ক্রনিক্যালি অনলাইন’ (অনলাইনে সারাদিন পড়ে থাকা) হয়ে বা মিম বানিয়ে রাজপথের দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালানো সম্ভব নয়। দিল্লির তীব্র গরম বা পুলিশের বাধার মুখে এই আন্দোলনের জেন-জি প্রতিনিধিদের মাঠপর্যায়ে টিকে থাকার ধৈর্য কতটা, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা। ক্ষমতাসীনেরা যাকে ‘তেলাপোকা’ বা ‘পরজীবী’ বলে অবহেলা করেছিলেন, তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে এই জীবটি ডাইনোসরদের বিলুপ্তির পরও টিকে ছিল পৃথিবীতে। ককরোচ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রায় দেবে না যে তারা ক্ষমতায় আসবে কিনা, বরং তাদের সাফল্য এটাই যে তারা ভারতের রাজনীতির ‘রটেন প্লেস’ বা পচা নর্দমাগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল ‘হুতোম প্যাঁচারা’ দিল্লির রাজপথ কাঁপিয়ে প্রমাণ করে দিল যে শিরোনামে থাকার জন্য সবসময় উচ্চকণ্ঠ, গম্ভীর স্লোগানের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো সমাজকে আয়না দেখানোর জন্য একটি অদ্ভুত প্রতীকই যথেষ্ট। তেলাপোকার ডানার ঝাপটায় ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কতটা বদলাবে, তা সময় বলবে, তবে জেন-জি যে মিম-কে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়েছে, তা নিশ্চিত।




