কলকাতার ছাদে ছাদে ‘জয় শ্রী রাম’
- নতুন দৃশ্যের আড়ালে কি বদলাচ্ছে মনস্তত্ত্ব

শুধু একটি-দুটি জায়গা নয়, বিভিন্ন পাড়া ঘুরলেই দেখা যাচ্ছে ‘বাড়ির ছাদে গেরুয়া পতাকা’
বর্ষা প্রায় আসব আসব করছে পশ্চিমবাংলায়। পাল্লা দিয়ে সেজে উঠছে প্রকৃতিও। ফুটতে শুরু করেছে জারুল, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়ার কুঁড়িও। তবে এসব দৃশ্যের বাইরেও কলকাতা শহরে কয়েকমাস ধরেই ঘুরছে আরেক নতুন আগন্তুক। শুধু একটি-দুটি জায়গা নয়, বিভিন্ন পাড়া ঘুরলেই দেখা যাচ্ছে ‘বাড়ির ছাদে গেরুয়া পতাকা’। তাতে লেখা ‘জয় শ্রী রাম’। না বাংলা ভাষায় নয়। জ্বলজ্বলে হিন্দি অক্ষরে। আগে অবশ্য এমনটা খুব একটা দেখা যেত না। অন্তত এত সংখ্যায় তো নয়ই। হনুমানের আবছা মুখ আঁকা 'জয় শ্রী রাম' লেখা এই পতাকার বিক্রি যে বহুগুণ বেড়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু এর কারণ কী?
দক্ষিণ কলকাতা থেকে উত্তর কলকাতা; আবার শহরতলির অনেক জায়গায়ই এখন এটাই পরিচিত দৃশ্য। কোথাও দু-একটি বাড়ি তো আবার কোথাও পুরো পাড়ার একের পর এক ছাদে গেরুয়া পতাকা উড়ছে। বিষয়টা তাই স্বাভাবিকভাবে অনেকেরই নজর কাড়ছে। দক্ষিণ কলকাতার নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা অরিন্দম মুখার্জী বললেন, ‘পতাকা ভক্তি থেকেই এই গেরুয়া লাগিয়েছি আমরা।’ তার কথায় এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়। তবে বাংলায় কেন 'জয় শ্রী রাম' লেখা হল না— এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য তিনি এড়িয়ে যান।
বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার অঙ্কুর ক্রমশ শিকড় ছড়াচ্ছে। তার প্রভাব তার ধীরে ধীরে পড়ছে সমাজের মধ্যেও। বিষয়টি সরাসরি কেউ স্বীকার না করলেও বিভিন্ন আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে এই প্রসঙ্গটিই
যদিও একই সঙ্গে অন্য প্রশ্নও উঠছে। বাঙালি হিন্দু বরাবরই দুর্গা, কালী বা কৃষ্ণের উপাসনায় ব্রতী থাকে। কলকাতা মানেই তো এক অর্থে দুর্গাপূজার শহর। সৃজনশীলতার ছড়াছড়ি। সেখানে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসব ওঠে সার্বজনীন।
রামের উপাসনা সেই অর্থে বাঙালির জীবনচর্চায় নবাগত। তার ওপর ‘জয় শ্রী রাম’— যেটা আবার হিন্দিতে লেখা, এভাবে হঠাৎ করেই এত জায়গায় দেখা যাওয়ায় অনেকেই বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখছেন।
পার্ক সার্কাসের সমাজসেবী নুসরাত হাসান বললেন, ‘ধর্ম নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ করে এত জায়গায় একসঙ্গে একই জিনিস দেখলে একটু অস্বস্তি লাগে। আগে তো এমনটা দেখিনি।’
দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিক্ষক আতিকুল ইসলামও একই কথা বললেন, ‘সবাই নিজের মতো থাকুক, আমরা এটাই চাই। কিন্তু এই বদলটা খুব দ্রুতগতিতে হচ্ছে, সেটা চোখে লাগে।’
অন্যদিকে, হাওড়ার রাজনীতিবিদ অমিত ঘোষের মত একটু আলাদা। তার মতে, ‘এটা শুধু ধর্ম নয়, একটা বড় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে। মানুষ এখন সেটাই দেখাতে চাইছে। ধর্মের সঙ্গে যখন রাজনীতি মেশে, তা ভয়ংকর রূপ নেবেই।’
কলকাতা এমন এক শহর, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভাষার ঊর্ধ্বে মানুষ ধারণ করেছে যুগের পর যুগ। তাই হয়তো শায়ের মির্জা গালিব ভালোবেসে বলতেন, ‘কলকাতা আমার হৃদয়ে যেন তীর মেরেছে’
অনেকের মতে, কয়েক বছরে পশ্চিমবাংলার মনস্তত্ত্বে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা চলছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। বিশেষ করে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার অঙ্কুর ক্রমশ শিকড় ছড়াচ্ছে। তার প্রভাব তার ধীরে ধীরে পড়ছে সমাজের মধ্যেও। বিষয়টি সরাসরি কেউ স্বীকার না করলেও বিভিন্ন আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে এই প্রসঙ্গই। আবার কেউ কেউ বলছেন, সামাজিক মাধ্যমেও এই প্রবণতা ছড়াচ্ছে দ্রুত। এক জায়গায় দেখে অন্য জায়গায়, অনেকে সেটিই অনুসরণ করছেন। অন্যদিকে 'জয় শ্রী রাম' স্লোগান দিতেও বাধ্য করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের। না বললেই চলছে মব লিঞ্চিং।
কলকাতা এমন এক শহর, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভাষার ঊর্ধ্বে মানুষ ধারণ করেছে যুগের পর যুগ। তাই হয়তো শায়ের মির্জা গালিব ভালোবেসে বলতেন, ‘কলকাতা আমার হৃদয়ে যেন তীর মেরেছে।
সেই কলকাতার ছাদগুলোতে আকস্মিক উড়তে থাকা এই ‘জয় শ্রী রাম' লেখা গুচ্ছ গুচ্ছ পতাকা শুধু একটা প্রতীক নয়— এটা শহরের ভেতরে চলতে থাকা এক নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সেই পরিবর্তনকে কেউ স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন, কেউ আবার চুপচাপ প্রশ্ন তুলছেন— একটু একটু করে কি বদলে যাচ্ছে কলকাতার চেনা সংস্কৃতি?




