শেষযাত্রা চট্টগ্রামে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উচ্চতা ১৮ তলা ভবনের সমান। আয়তন দুটি ফুটবল খেলার মাঠের সমান। ওজন প্রায় ২৫ হাজার টন। বিশালাকৃতির এমন জাহাজ এখন বাড়বকুণ্ড বঙ্গোপসাগর উপকূলে। ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরে বানানো এই জাহাজের অন্তিমযাত্রা এখন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি শিপইয়ার্ডে। সমুদ্রগামী কোনো জাহাজের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর হলেও, এটির জীবনকাল মাত্র আট বছর!
কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল আধুনিক দুনিয়ার দ্রুত প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কথা। বিশেষায়িত কাজের জন্যই এ বার্জ বানানো হয়েছিল। এখন এর চেয়ে বেশি দক্ষ-সাশ্রয়ী বার্জ তৈরি হয়েছে। ফলে পুরনো প্রযুক্তির কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো মালিকপক্ষের জন্য হয়ে পড়েছিল দুঃসাধ্য। এতে করে বার্জটি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এত বড় জাহাজ কত দামে কেনা হয়েছে, সে ব্যাপারে তথ্য জানাতে রাজি হয়নি বাংলাদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। তবে ধারণা করা যায়, বর্তমানে প্রতি এলডিটির বিক্রয় মূল্য প্রায় ৪৮০-৪৯০ ডলার। সে অনুযায়ী, ২৫ হাজার এলডিটির শুধু স্ক্র্যাপ হিসেবেই এর মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১২.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪৫-১৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে বিক্রিযোগ্য জেনারেটর থেকে অনেক সরঞ্জাম আছে। ফলে জাহাজটি থেকে ২০০ কোটি টাকা আয় করতে পারে এস এন করপোরেশন।
বিশাল এই বার্জ সমুদ্রের নিচে ডুব দিয়ে হাজার হাজার টন ধাতব কাঠামো উপড়ে আনত। লোহার কাঠামো ভেঙে টুকরো করে নিজের কোলে নিয়ে সাগরেই ভেসে উঠত। পরিষ্কার করত সমুদ্রের 'লোহার জঞ্জাল'। দক্ষিণ থেকে উত্তর আমেরিকার সাগরে ছিল যার অবাধ বিচরণ। আয়ু ফুরিয়ে আসায় নিজেকেই স্ক্র্যাপের ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে। বিশেষায়িত বার্জটির নাম ‘ফেলস ক্যান ডু টু’।
ভাঙার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রামের এস এন শিপইয়ার্ডে আনা হয়েছে ১৯ এপ্রিল। বার্জটি এখন নিজ থেকে চলে না। তাই সিঙ্গাপুর থেকে টেনে আনা হয়েছে বিশেষায়িত টাগবোট দিয়ে। আর বঙ্গোপসাগর থেকে বার্জটি চালিয়ে সীতাকুণ্ড উপকূলে আনেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে জাহাজ চালানোয় বিশেষ পারদর্শী ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলছেন, ‘এ ধরনের বার্জ সাধারণত আমরা পাই না। অনেকটা অ্যাবনরমাল আবার মৃত বার্জ অর্থাৎ নিজে থেকে সেটি চলার সুযোগ নেই। ২২১ মিটার লম্বা এবং ৭৯ মিটার প্রশস্ত জাহাজটি টেনে সীতাকুণ্ড উপকূলে নেওয়ার জন্য নিতে হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।’
কষ্ট করে ধৈর্য ধরে এই জাহাজ উপকূলে ভেড়ানোর কাহিনি তুলে ধরেন তিনি, ‘বহির্নোঙর থেকে শিপইয়ার্ড পর্যন্ত একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ টেনে নিতে এক ঘণ্টা লাগে। আর এই বার্জ টেনে নিতে লেগেছে তিন ঘণ্টার বেশি। আবার ২৮ হাজার হর্স পাওয়ার বা অশ্বশক্তির চারটি টাগবোটের সমন্বয়ে সেটি টেনে নিতে বেশ সতর্ক থাকতে হয়েছে।’
দেশের অন্যতম শীর্ষ জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান এবং প্রথম সারির গ্রিন শিপইয়ার্ড এস এন করপোরেশন এই বিশালাকৃতির বার্জটি কিনেছে। এস এন করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা শওকত আলী চৌধুরী বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান।
বার্জে এমন লোভনীয় আইটেম আছে, যা অন্য স্ক্র্যাপ জাহাজে নেই। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ২৫ থেকে ১০৮ মিমি পুরুত্বের স্টিল প্লেট আছে। এ ধরনের প্লেট দেশের ভারী শিল্পকারখানাগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করে চড়া দামে। এখন আমাদের কাছ থেকেই কিনতে পারবে। আর আছে বেশ কিছু পাওয়ারফুল জেনারেটর— জানালেন বরকত উল্লাহ। তিনি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা।
জাহাজটিতে ২৫ হাজার লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টন (এলডিটি) স্ক্র্যাপ আছে। এর মধ্যে হয়তো ৫ শতাংশ নষ্ট হতে পারে। আর জাহাজটির বয়স কম থাকায় লোহাগুলো আছে এখনো ভালো অবস্থায়। এটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। এই বার্জ সম্পূর্ণ কেটে লোহায় রূপান্তর করতে প্রায় ৬ থেকে ৯ মাস সময় লাগবে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অফশোর রিসাইক্লিং বার্জ ‘ফেলস ক্যান ডু টু’ সাধারণ কোনো বার্জ নয়, এটি একটি সেমি-সাবমার্সিবল বার্জ। এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো— ‘ডাইভিং’ বা সাগরের পানিতে ডুব দেওয়ার ক্ষমতা। এটি সমুদ্রের নিচে প্রায় ৩৩ মিটার পর্যন্ত নিজেকে ডুবিয়ে দিতে পারত। এরপর সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা অকেজো ড্রিলিং রিগ বা বিশালাকার ডুবন্ত লোহার কাঠামোকে নিজের ওপর তুলে নিয়ে ফের ভেসে উঠত। এই অসাধ্য সাধনের জন্য বার্জে রয়েছে ১২টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালাস্ট বা পানি নিষ্কাশনের পাম্প। ২২০.৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭৯ মিটার প্রস্থের এই বার্জটি যেন একটি আস্ত ভাসমান কারখানা, যার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১০ মেগাওয়াট।
বার্জের সবচেয়ে বিশেষত্ব হলো, এর চার কোনায় চারটি বিশাল টাওয়ার। প্রতিটি টাওয়ার প্রায় ৬০ মিটার লম্বা, যা একটি ১৮ তলা ভবনের সমান উঁচু। এটি সত্যিই একটি বিশাল আকৃতির। একটি আদর্শ ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০০ থেকে ১১০ মিটার এবং প্রস্থ ৬৪ থেকে ৭৫ মিটারের মতো হয়ে থাকে। সেই হিসাবে বার্জটি প্রকৃতপক্ষে দুটি ফুটবল মাঠ পাশাপাশি রাখলে যে আয়তন হয়, তার চেয়েও বড়। সাগরের ৩৩ মিটার নিচে ডুব দিয়ে আস্ত লোহার কাঠামো তুলে আনার সময় এ টাওয়ারগুলোর সাহায্যেই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যেও নিজের ভারসাম্য বজায় রাখত। এর বিশালাকার ডেক স্পেস এবং শক্তিশালী ক্রেন এটিকে সমুদ্রের মাঝখানে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত করেছিল।
সর্বশেষ ব্রাজিলের উপকূলে গভীর সমুদ্রে একটি বিশাল তেল-গ্যাস উত্তোলন প্ল্যাটফর্ম বা অফশোর ড্রিলিং রিগ স্থানান্তরের কাজ করেছিল বার্জটি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক কেপেল অফশোর অ্যান্ড মেরিন তাদের সম্পদ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে সেটি নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সেটি কিনে নেয় এস এন করপোরেশন।






