কলম যখন তলোয়ার
কাঙাল হরিনাথ এবং মুক্ত সাংবাদিকতার একাল-সেকাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আমি লেখক, আমিই সম্পাদক, আমিই পত্রিকা লেফাফা ও বিলিকারক এবং আমিই মূল্য আদায়কারী...’। নিজের সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে এভাবেই আপসহীন লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন গ্রামীণ সাংবাদিকতার প্রবাদ পুরুষ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। উনিশ শতকের এক নিভৃত পল্লী থেকে যখন এই দম্ভোক্তি উচ্চারিত হয়েছিল, তখন কাঁপন ধরেছিল প্রতাপশালী ব্রিটিশ নীলকর আর অত্যাচারী জমিদারদের গদিতে। সেই মানুষটি ছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলি, তখন ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়—আজ থেকে দেড়শ বছর আগেই এই ভূখণ্ডে সাংবাদিকতার এক আপসহীন ও আদর্শিক যুদ্ধ লড়েছিলেন এক ‘কাঙাল’।
১৮৬৩ সাল। চারদিকে যখন ব্রিটিশদের শাসন আর জমিদারদের শোষণ, তখন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’। আজকের ডিজিটাল যুগের সাংবাদিকতায় আমরা যখন ‘হাইপার-লোকাল’ বা ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’র কথা বলি, হরিনাথ মজুমদার তার প্রবর্তন করেছিলেন তখনই। তিনি শহরে বসে বড় মানুষের গুণগান করেননি; বরং মেঠোপথের ধুলোমাখা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জমিদারদের খাজনা আদায়ের জুলুম আর নীলকরদের চাবুকের দাগ কলমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, যখন ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলার কৃষক সমাজ, ঠিক তখন ১৮৫৭ সালে নিভৃত পল্লী থেকে হাতে লিখে হরিনাথ মজুমদার প্রকাশ করেন ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’। ১৮৬৩ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। প্রথমে মাসিক হলেও পরে এটি পাক্ষিক ও সাপ্তাহিকে পরিণত হয়। যেখানে গ্রামীণ শোষণ, নীলকরদের অত্যাচার এবং তৎকালীন সমাজের নানা কুসংস্কারের অসাড়তা তুলে ধরে প্রকাশিত হতো বিভিন্ন লেখা। যেখানে তৎকালীন বড় বড় পত্রিকা শহরের বাবুদের তোষামোদে ব্যস্ত ছিল, সেখানে হরিনাথ কলম ধরেছিলেন নীলকর সাহেব আর অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে।
হরিনাথের সত্যনিষ্ঠা এতটাই প্রবল এবং তার কলম এতটাই ধারালো ছিল যে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারসহ তৎকালীন প্রতাপশালী জমিদারদের রোষানলে পড়েন। তাকে নিশ্চিহ্ন করতে লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়েছিলেন জমিদাররা। কিন্তু সত্যের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন তার পরম বন্ধু ও ভাবশিষ্য বাউল সম্রাট লালন শাহ। শিষ্য হরিনাথ ও তার বিখ্যাত ‘এমএন প্রেস’ রক্ষা করতে লালন সাঁইজি অনুসারীদের নিয়ে দিনের পর দিন দিয়েছেন পাহারা। শুধু বন্ধুত্বের টানে নয়, বরং সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ছেঁউড়িয়া থেকে কুমারখালীতে ছুটে এসে শিষ্যদের নিয়ে তাঁবু টানিয়ে ঘাঁটি গেড়েছিলেন লালন। সাঁইজির অনুসারীদের সেই প্রতিবাদের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন জমিদারের লাঠিয়ালরা। এ ঘটনাটি সাংবাদিকতার ইতিহাসে লেখক এবং সংহতির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেই ঐতিহাসিক প্রেস আজও কুমারখালীতে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কাঙাল হরিনাথের সেই ছাপাখানাটি শুধু কাগজ ছাপার যন্ত্র ছিল না, ছিল সাহিত্য ও সংগ্রামের তীর্থস্থান। এই প্রেসে এসেই সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি হয়েছিল মীর মশাররফ হোসেনের। তার অমর সৃষ্টি ‘বিষাদ সিন্ধু’ প্রথম আলোর মুখ দেখে এই প্রেস থেকেই। এমনকি বাউল সম্রাট লালন সাঁইজির বিখ্যাত গান—‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’—সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে ঠাঁই পেয়েছিল কাঙালের এই প্রেসে। এটি শুধু একটি ছাপাখানা ছিল না, ছিল শোষিতের কণ্ঠস্বর।
সেকাল বনাম একাল : প্রযুক্তির জয়জয়কার, আদর্শের সংকট?
সাংবাদিকতা আজ ছাপাখানা আর ডাকযোগের যুগ পেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুতগতির যুগে পদার্পণ করেছে। তথ্যের প্রবাহ এখন তাৎক্ষণিক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে সংবাদপত্রের সেই নির্ভীকতা আর নিরপেক্ষতা কি অটুট আছে?
মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আজকের এই দিনে কাঙাল হরিনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি একটি লড়াই। করপোরেট প্রভাব আর নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে যখন গণমাধ্যম অনেক সময় কোণঠাসা, তখন হরিনাথের ‘এক পয়সার’ পত্রিকা আমাদের দেখায়—সাহস থাকলে নিভৃত পল্লী থেকেও সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব।
মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে কাঙাল হরিনাথের সেই আদর্শ—‘যেখানেই দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই’—ফের জাগ্রত হোক, এটাই হোক আজকের প্রত্যাশা।
সেই উনিশ শতকের ‘এক পয়সার’ কাগজের জন্য হরিনাথকে ফেরিওয়ালার মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো। বর্তমানের দ্রুতগতির ডিজিটাল আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু কাঙাল হরিনাথের সেই নির্ভীক সাংবাদিকতার উত্তরসূরি কি আমরা হতে পেরেছি?
আজ প্রযুক্তির আড়ালে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যখন তথ্যের বিকৃতি ঘটায়, তখন বারবার মনে পড়ে হরিনাথের সেই
জীবনদর্শন : ‘যেখানেই দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো লুকানো রতন’।
কুমারখালীতে আজ কাঙাল হরিনাথের স্মরণে আধুনিক জাদুঘর হয়েছে, তার স্মৃতিবিজড়িত ছাপাযন্ত্রটি সেখানে সযত্নে রাখা আছে। কিন্তু যে ‘কাঙাল কুটিরে’ বসে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন, তার দেয়াল আজ খসে পড়ছে, আগাছায় ঢেকে গেছে মেঝের ধূলিকণা। দেশের সাংবাদিকতার বর্তমান ‘ঘুণে ধরা’ দশা যেন সেই ভাঙা কুটিরের মাঝেই মূর্ত হয়ে উঠেছে।
আজকের এই দিনে কাঙাল হরিনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাংবাদিকতা কোনো পণ্য নয়, বরং এটি একটি দায়বদ্ধতা। তার সেই বিখ্যাত গান ‘ওহে দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার কর আমারে...’ আজ যেন শুধু পারমার্থিক সংগীত নয়, বরং বর্তমান সাংবাদিকতার ক্রান্তিকালের এক গভীর আর্তি।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সত্যের প্রকাশে আমরা থাকব অবিচল, ঠিক যেমনটি ছিলেন কুমারখালীর সেই কাঙাল হরিনাথ।



