সীমান্তে যাত্রী কমে তলানিতে, ভিসা সংকট বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গেদে স্থলবন্দর ও পেট্রাপোল সীমান্ত। সম্প্রতি এ বন্দর দিয়ে চোখে পড়ার মতো কমে গেছে যাত্রী পারাপারের সংখ্যা। ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব আবেদন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণেই এ মন্দা পরিস্থিতি।
গেদে স্থলবন্দর দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০ শতাংশ যাত্রী পারাপার করছে; যেখানে আগে এই হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এই বন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন পারাপার হতো প্রায় এক হাজার যাত্রী। এখন তা কমে এসেছে ১০০ থেকে ১৫০ জনের মধ্যে।
এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল। ফলে সীমান্তের অর্থনৈতিক কার্যকলাপও হয়েছে সংকুচিত
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই গেদে এবং পেট্রাপোল বন্দরে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমছে। ফলে বড় প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়েও। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আগত যাত্রীর একটি বড় অংশ এখনো মেডিকেল ভিসার ওপর নির্ভরশীল।
পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত হয়ে পড়েছে সীমিত। যদিও গেদে সীমান্ত দিয়ে প্রতি মাসে চলাচল করছে ৭-৮টি পণ্যবাহী ট্রেন। অন্যদিকে এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল। ফলে সীমান্তের অর্থনৈতিক কার্যকলাপও হয়েছে সংকুচিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মানি এক্সচেঞ্জার গৌতম নাথ বলছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব আবেদন নিয়ে সরাসরি প্রভাব না পড়লেও ভিসা সমস্যার কারণে কমে গেছে অনেক লেনদেন। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকার লেনদেন হতো; এখন তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আশা করছি আবার ব্যবসা চাঙ্গা হবে।’
তার মতে, শুধু মানি এক্সচেঞ্জার নন, ঠেলাওয়ালা, মুটিয়া সীমান্তনির্ভর বহু মানুষের জীবিকা আজ সংকটের মুখে।
বাংলাদেশ থেকে আগত একাধিক যাত্রী জানিয়েছে, তারা মূলত ভারতে আসছে চিকিৎসার জন্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে। ওই ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক টানাপড়েন হয়ে ওঠে আরও তীব্র। বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর সামনে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বাণিজ্য ও যাতায়াতে। তাদের ভাষ্য, অতীতে দুই দেশের সুসম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি সে ভারসাম্য কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছে।
বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ ধরনের উত্তেজনা বেড়ে যায় আরও।
এদিকে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কিছু নেতা আশ্রয় নিয়েছেন, এমন জল্পনা রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। যদিও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে। তবুও পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, একদিকে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে বাংলাদেশের অস্থির পরিস্থিতি— এ দুইয়ের চাপে সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতি ও জনজীবন হয়ে পড়ছে বিপর্যস্ত।
আশা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে আবারও গেদে ও পেট্রাপোল সীমান্তে বাড়বে যাত্রীর চলাচল। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে এগোবে স্থিতিশীলতার পথে। এখন নজর দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, কারণ সেখানেই লুকিয়ে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।


