পাহাড়ে হাম সংক্রমণ
বনের গাছ কেটে সড়ক, তবু পৌঁছায় না জীবনদায়ী টিকা
- মৃত্যুর খবর পাহাড়ের ভাঁজ বেয়ে সমতলে যেতে পাঁচ দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সবুজ পাহাড়ের বুকচিরে কালো পিচঢালা পথ। ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’-এর বুকচিরে সেই পথ চলে গেছে পাহাড়ের গভীরে—পোয়ামুহুরী পর্যন্ত। পর্যটকরা বাইক বা জিপ নিয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যান প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কিন্তু সেই পথ ধরে সময়মতো পৌঁছাতে পারল না জীবনদায়ী টিকা। ফলে, রাঙামাটি আর খাগড়াছড়ি যখন ‘হামমুক্ত’ থাকার স্বস্তিতে, তখন বান্দরবানের আলীকদমের পাহাড়ি পাড়াগুলোয় নেমে এসেছে ঘোর বিষাদ। দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাহাড়ের ভাঁজ বেয়ে সমতলে পৌঁছাতে সময় লেগেছে পাঁচ দিন। এই দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়, এ যেন প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবার এক নিদারুণ ব্যবধান।
হাম সংক্রমণে পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলার বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। যখন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পর্যাপ্ত টিকা মজুদ এবং আগাম সতর্কতায় সংক্রমণ শূন্য রাখতে পেরেছে, তখন বান্দরবানের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এ দুই জেলায় এখন পর্যন্ত একজনও হাম আক্রান্ত শিশুর খোঁজ মেলেনি। কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি এবং নজরদারি কঠোর থাকায় স্বস্তিতে সেখানকার অভিভাবকরা।
অন্যদিকে বান্দরবানের পরিস্থিতি ভিন্ন। এ জেলায় কয়েক দিন আগেই আট শিশুর দেহে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আলীকদম এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে সংক্রমণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সরকারি হিসাবেই জেলায় অন্তত ৬৮ সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়।
সুন্দর সড়ক থাকলেই সেবা পৌঁছায় না, তার জন্য প্রয়োজন দায়বদ্ধতা। পর্যটকের বাইক যে পথে চলে, সেই পথে টিকার বক্স কেন পৌঁছাবে না
জানা গেছে, জেলায় হামের টিকাদানের লক্ষ্য ৫৮ হাজার ৪১৩ জন শিশুকে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী জেলার সাত উপজেলার মধ্যে রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় হামের প্রকোপ নেই। আক্রান্তদের সবাই আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং লামা ও সদর উপজেলায়। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, আলীকদম উপজেলার বেশিরভাগ রোগী কুরুকপাতা ইউনিয়নের।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, গত এপ্রিলের শুরুতে কুরুকপাতা ইউনিয়নে প্রথম হামের প্রকোপ দেখা দেয়। ৯ থেকে ১০ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে দুই ম্রো শিশুর মৃত্যু হয়। ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রিংলতপাড়ায় গত ১১ এপ্রিল (শনিবার) ওই দুই শিশু মারা যায়। কিন্তু এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম এবং সেখানে মোবাইল ফোন বা টেলিফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় এ খবর উপজেলা সদরে পৌঁছায় ১৬ এপ্রিল।
বনের গাছ কেটে মনোরম সড়ক হয়েছে। তা দিয়ে পর্যটকরা আসতে পারলেও স্বাস্থ্যকর্মীরা আসতে পারেন না। তাহলে শিশুদের হামের টিকা দেবে কে?
আর হামে দুই শিশুর মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
শিশু দুটির পরিবার জানায়, মৃত্যুর আগে তাদের শরীরে তীব্র জ্বর এবং ছোট ছোট ফোসকা বা লালচে দানা দেখা দিয়েছিল।
রিংলতপাড়ার বাসিন্দা তনওয়াই ম্রো জানান, তার বোনসহ ওই গ্রামের আরও তিন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তিনি দাবি করেন, রিংলতপাড়াসহ আশপাশের আরও তিনটি পাড়ায় অন্তত ২০-৩০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত অবস্থায় ছিল, যাদের উপজেলা সদরের হাসপাতালে আনা সম্ভব হয়নি।
কাগজে-কলমে কভারেজ, বাস্তবে শূন্যতা
আলীকদমের কুরুকপাতা ও পোয়ামুহুরী এলাকার মানুষের অভিযোগ—কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যসেবার কভারেজ দেখানো হলেও দুর্গম পাড়াগুলোয় কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াং রাই ম্রোর ক্ষোভভরা প্রশ্ন, ‘বনের গাছ কেটে মনোরম সড়ক হয়েছে। তা দিয়ে পর্যটকরা আসতে পারলেও স্বাস্থ্যকর্মীরা আসতে পারেন না। তাহলে শিশুদের হামের টিকা দেবে কে?’
রিংলতপাড়ায় গত ৯ ও ১০ এপ্রিল তিন মাসের জং রুং ম্রো এবং সাত মাসের খতং ম্রো মারা যায়। কিন্তু নেটওয়ার্কহীন সেই পাহাড় থেকে মৃত্যুর খবর উপজেলা সদরে পৌঁছাতে ১৬ এপ্রিল হয়ে যায়। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ প্রথমে মৃত্যুর খবর স্বীকার না করলেও পরে সংক্রমণের ভয়াবহতা অনুভব করে সেখানে অস্থায়ী ক্যাম্প হাসপাতাল খোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম এলাকাগুলোয় টিকাদানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের তথ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ২৫ এপ্রিল থেকে আলীকদমের কুরুকপাতা বাজারে চালু করা হয়েছে ১০ শয্যার অস্থায়ী ক্যাম্প হাসপাতাল। যেখানে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন মেডিকেল অফিসার ও নার্স, যাতে দুর্গম পাড়ার শিশুদের আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে আসতে না হয়।
কেন এই ব্যর্থতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. চিং শোয়ে ফ্রু জানান, হামের এক ডোজ টিকা ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজ ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। বান্দরবানের সব এলাকায় টিকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কেন হাম ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাব এই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।
রাঙামাটির সাফল্য প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা থাকলে পাহাড়ের দুর্গমতা কোনো বাধা নয়। অন্যদিকে বান্দরবানের আলীকদমের কান্না মনে করিয়ে দেয়—সুন্দর সড়ক থাকলেই সেবা পৌঁছায় না, তার জন্য প্রয়োজন দায়বদ্ধতা। পর্যটকের বাইক যে পথে চলে, সেই পথে টিকার বক্স কেন পৌঁছাবে না—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কি কেউই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, একসময় নৌকা বা ইঞ্জিন বোট এবং পায়ে হাঁটা ছাড়া আলীকদমের তৈন, কুরুকপাতা ও পোয়ামুহুরী এলাকায় যাওয়া-আসার কোনো উপায় ছিল না। এখন উপজেলা সদর থেকে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’-এর বুকচিরে বয়ে যাওয়া পিচঢালা পাহাড়ি পথ চলে গেছে পোয়ামুহুরী পর্যন্ত। বাইক বা যেকোনো গাড়িতে করে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে পোয়ামুহুরী পৌঁছানো যায়। তবু আলীকদম সদর ছাড়া সব এলাকা সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্গমই রয়ে গেছে।
স্থানীয়রা বলেছেন, আন্তঃপাড়াগুলোয় হেঁটে যেতে হলেও আগের মতো কষ্টকর নয়। তবু সরকারি দপ্তরের লোকজন খুব একটা আসেন না।
যদিও বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন হোসাইন চৌধুরীর দাবি, যোগাযোগের ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘যোগাযোগের দুর্গমতার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মীরা কোনো অবহেলা করেছেন কি না—তা আমরা তদন্ত করে দেখছি।’
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের এই প্রধান শোনালেন আশাবাদের কথাও। ডা. শাহীন বললেন, ‘আমরা আশা করছি, বিগত দিনে স্বাস্থ্যসেবায় কোনো শিথিলতা থাকলে, বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প তা পূরণ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিয়ে আসতে সক্ষম হব।’





