৬১ জেলায় হামের থাবা
পাহাড়ে সংক্রমণের ভিন্ন চিত্র, দেখাচ্ছে আগামীর পথ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এখন শুধুই কান্নার সুর। কোথাও জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আদরের সন্তানের কপাল, কোথাও শরীরে ফুটে ওঠা লালচে দানার যন্ত্রণায় ছটফট করছে ফুলের মতো শিশুরা। যে বয়সে হাতে থাকার কথা খেলনা, সেই বয়সে হাজারো শিশু লড়ছে মৃত্যুর সমান্তরাল এক যুদ্ধে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যখন দেশের ৬১টি জেলায় হামের সংক্রমণের ভয়াবহতা নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করছে, তখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুরনো ক্ষতগুলো আবারও দগদগে হয়ে উঠেছে।
তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও যেন এক চিলতে রুপালি রেখা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পার্বত্য দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। যখন সমতলের হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, তখন পাহাড়ের কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি দেখাচ্ছে আগামীর পথ। পাহাড়ের এমন সফলতার পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—পর্যাপ্ত টিকার মজুদ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দুর্গম পথে পদযাত্রা।
রাঙামাটি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শওকত আকবর বলছিলেন, হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পাননি তারা।
হাম সংক্রমণের আতঙ্ক যখন ভর করেছে দেশের প্রায় সব জনপদে, তখন রাঙামাটির বনরূপা এলাকার ব্যবসায়ী মো. নাজিম উদ্দিনের কণ্ঠে ঝরল কিছুটা স্বস্তি। তিনি বলছিলেন, ‘এইটা আপাতত স্বস্তির যে, এখনো জেলায় হাম আক্রান্ত হয়নি কোনো শিশু, তার মানে এই না যে, আমাদের শিশুরা এর ঝুঁকির বাইরে। একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন। তবে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আশা করি, আমাদের ভয় ও উদ্বেগ কাটবে। একই সঙ্গে সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, টিকাদান কার্যক্রমে যেন কোনো অবহেলা করা না হয়। প্রতি বছর যেন এই কার্যক্রম চালানো হয়।’
দেশে যখন হাম-রুবেলা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু, সে সময়ের পর থেকে জেলার দুর্গম অঞ্চলে ১৩ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা
রাঙামাটি জেলা হাম সংক্রমণের বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার মূল কারণ হলো, টিকার পর্যাপ্ত মজুদ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা। স্থানীয় পর্যায়ে হামের লক্ষণ (যেমন : জ্বর, শরীরে লালচে দানা, সর্দি-কাশি) দেখা দিলে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে দ্রুত কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের। এ ছাড়া হামের জটিলতা কমাতে শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ওপরও দেওয়া হচ্ছে জোর। যে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের।
রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় হামের টিকার পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে জেলায় টিকার মজুদ ছিল প্রায় ১৭ হাজার ডোজ। ২০ এপ্রিল থেকে কাউখালী উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি মাসে অন্তত ১ হাজার ১৫০ শিশুকে দেওয়া হচ্ছে টিকা। এই কর্মসূচিতে জেলার ৬৪ হাজার শিশুকে দেওয়া হবে হামের টিকা। প্রথম চার দিনেই ১৮ হাজার ৯৩৬ শিশুকে দেওয়া হয়েছে টিকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ ভাগ। টিকাদান কার্যক্রম চলবে ১০ মে পর্যন্ত।
এপ্রিলে কাউখালী উপজেলায় হামের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল চার শিশুর শরীরে। স্বাস্থ্য বিভাগ দ্রুত তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠায় ঢাকায়। তবে আক্রান্ত শিশুরা নিজ নিজ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। এর বাইরে খবর পাওয়া যায়নি বড় কোনো প্রাদুর্ভাবের।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, রাঙামাটিতে টিকাদানের হার সন্তোষজনক হওয়ায় এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলাটি এখনো বড় ধরনের বিপর্যয়ের বাইরে রয়েছে।
পরিকল্পনা সঠিক থাকলে মহামারিও রুখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাকি ৬১টি জেলার শিশুদের কী হবে? স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলা আর টিকার ঘাটতির দায় কার? উত্তর খোঁজার চেয়ে এখন বড় প্রয়োজন প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় টিকা পৌঁছে দেওয়া। নতুবা এই লালচে দানাগুলো শুধু শরীর নয়, ক্ষতবিক্ষত করে দেবে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
জেলাটির সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা জানান, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তারা জনসংখ্যার অনুপাতে সঠিক সংখ্যায় টিকা সংগ্রহ করেছিলেন এবং নিশ্চিত করেছেন তার যথাযথ ব্যবহার। ‘হামের টিকা জনসংখ্যানুপাতে যতটুকু পাওয়ার কথা, সেটাই পেয়েছিলাম আমরা ইন্টেরিম আমলে। ফলে অন্যান্য জেলায় টিকা স্বল্পতার নানা তথ্য শোনা গেলেও আমাদের জেলায় পর্যাপ্ত টিকা ছিল। আমরা তা ঠিকভাবে ব্যবহারও করেছি। ফলে হাম নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু হয়নি রাঙামাটিতে।’
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের এই প্রধান জানালেন, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ জন সন্দেহভাজন শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা হলেও কারোর শরীরেই সংক্রমণ মেলেনি। ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ কর্মসূচিতে এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৩০ শতাংশের বেশি (অন্তত ২০ হাজার শিশু) টিকার আওতায় এসেছে।
খাগড়াছড়ির চিত্রও প্রায় একই রকম। দেশ জুড়ে হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়লেও এই জেলাটিতে এখন পর্যন্ত হাম পজিটিভ কেউ শনাক্ত হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ কিছুটা স্বস্থির মধ্যে রয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ রয়েছে সতর্ক অবস্থানে, রোগ প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে চলছে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি।
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবের জানালেন, জেলার দুর্গম এলাকার ১ হাজার ৫১৯টি কেন্দ্রে চলছে টিকাদান। এর মধ্যে বিদ্যালয়কেন্দ্রিক কেন্দ্র ৫৭৪টি, কমিউনিটি কেন্দ্র ৯৪৫টি। কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৭৮টিরই অবস্থান দুর্গম এলাকায়। অনেকগুলোই আবার পাহাড়ের এমন গভীরে, যেখানে পৌঁছানো সাধারণ মানুষের জন্য একপ্রকার দুঃসাধ্যই। এই জেলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে আগামী ১০ মে পর্যন্ত চলবে টিকাদান। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আনা হয়েছে টিকার আওতায়। জেলায় ৭৯ হাজার ৪৩২ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে।
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবেরের দাবি, টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবেই চলছে। তিনি বললেন, ‘কোনো অভিযোগ এখনো আসেনি। দেশে যখন হাম-রুবেলা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু, সে সময়ের পর থেকে জেলার দুর্গম অঞ্চলে ১৩ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। সাধারণত পরীক্ষায় পজিটিভ হলে তাড়াতাড়ি ফল পাঠানো হয়। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, সবই নেগেটিভ ফল আসবে।’
হাম-রুবেলা প্রতিরোধে টিকার বিকল্প নেই—এমন সতর্কবার্তার পাশাপাশি এই চিকিৎসক দিলেন কিছু পরামর্শও। ছাবের বললেন, ‘হাম হলে সাধারণত শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, চোখ থেকে পানি পড়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। রোগ শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করানো গেলে সাধারণত ৯৫ শতাংশ শিশু সাধারণ চিকিৎসায় ভালো হয়। আর যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বয়সের তুলনায় ওজন কম, তাদের ক্ষেত্রে হাম বিপজ্জনক।’
জানা গেছে, জেলার সদর হাসপাতালসহ সব উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম আক্রান্তদের জন্য করা হয়েছে আলাদা কর্নার। হামের রোগী শনাক্ত হলে তাদের চিকিৎসায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে সবগুলো হাসপাতাল।
তবে পাহাড় স্বস্তিতে থাকলেও সমতলের চিত্রপট পুরোই উল্টো। হাসপাতালগুলোর মেঝেতে মায়েদের কোল পেতে বসে থাকা আর প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে সাধারণ মানুষের হাহাকার এখন নিত্যদিনের চিত্র। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের জটিলতা কমাতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল এবং দ্রুত আইসোলেশন নিশ্চিত জরুরি। কিন্তু অনেক জেলায়ই আইসোলেশন বেডের সংকট প্রকট।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪-২৫ সালে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদানে শিথিলতার খেসারত দিচ্ছে এখনকার শিশুরা। দেশের ৯১ শতাংশ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
পরিস্থিতির উন্নতিতে কয়েকটি সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞরা। যার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে কঠোর নজরদারি এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা প্রদান।
তারা আরও বলেন, রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ি শিখিয়েছে, পরিকল্পনা সঠিক থাকলে মহামারিও রুখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাকি ৬১টি জেলার শিশুদের কী হবে? স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলা আর টিকার ঘাটতির দায় কার? উত্তর খোঁজার চেয়ে এখন বড় প্রয়োজন প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় টিকা পৌঁছে দেওয়া। নতুবা এই লালচে দানাগুলো শুধু শরীর নয়, ক্ষতবিক্ষত করে দেবে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
সমতলের কোনো এক হাসপাতালের বারান্দায় যখন এক মা তার জ্বরে তপ্ত শিশুকে নিয়ে টিকার জন্য হাহাকার করছেন, ঠিক তখনই রাঙামাটির কোনো এক দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকার বক্স হাতে পৌঁছাচ্ছেন। এই বৈপরীত্যই বলে দেয়—সদিচ্ছা আর সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে মহামারীকেও পাহাড়ের ওপারে আটকে রাখা সম্ভব।
দেশ জুড়ে সংক্রামক রোগ হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার তথ্য তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলাতেই শনাক্ত হয়েছে এ রোগের সংক্রমণ। শুধু পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটি জেলায় এখনো কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। বাংলাদেশে বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডব্লিউএইচও ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধিরা জানান, দেড় মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তির মধ্যেও দেখা যাচ্ছে হামের সংক্রমণ। উন্নত দেশে হামে মৃত্যুহার যেখানে ১ থেকে ৩ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে তা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যা নির্দেশ করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদানে শিথিলতার কারণে দেখা দিয়েছে এই প্রাদুর্ভাব। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে মানুষের যাতায়াতের ফলে ‘উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে আন্তঃদেশীয় সংক্রমণের ঝুঁকি।




