উৎকণ্ঠায় ১২ হাজার পরিবার
‘এবারে বাঁধ না টিকলে হামার আম-ছালা সউগ যাইবে’

ছবি: আগামীর সময়
‘দিন আনি দিন খাই, এমনিতে হামারগুলার সংসার চলে না। তারপরও বাঁচার জন্য ঘটি-বাটি বেচে টাকা দিয়া নিজেরাই বাঁধ দিচি। এবারে বাঁধ না টিকলে হামার আম-ছালা সবই যাইবে।’ রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীতে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন চিলাখাল চরের লেজ মিয়া।
নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধে বর্ষার আগেই ভাঙন শুরু হওয়ায় উৎকণ্ঠায় রয়েছে পাঁচটি চরগ্রামের অন্তত ১২ হাজার পরিবার। বাঁধ রক্ষায় চরবাসী উপজেলা প্রশাসনসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছে। গত কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলে চরের অভাবী মানুষজন চর নোহালী ও বাগডোহরা এলাকায় দু’টি বাঁধ নির্মাণ করে।
তিন বছর আগে বন্যায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন করলে তিস্তার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। ওই সময় বাগডোহরা চরের নিচাপাড়া এলাকার তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী দফায় দফায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্বারস্থ হলেও কোনো ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় কয়েকটি চরগ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে নিজেরাই দিনরাত শ্রম দিয়ে বাঁধ দু’টি নির্মাণ করে। এর মধ্যে তিন বছর আগে শুরু করা পাশ্ববর্তী লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি থেকে বাগডোহরা মিনার বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বাঁধের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া এই বাঁধটি রক্ষার সহায়ক হিসেবে উজানে চর নোহালী এলাকায় ব্রীফ বাজার থেকে কাচারিপাড়া পর্যন্ত দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের বন্যা-ভাঙনে বাগডোহরা এলাকায় দুই শতাধিক একর আবাদি জমি বিলীন হলেও স্বেচ্ছাশ্রমের বাঁধ দু’টির কারণে ঘরবাড়ি রক্ষা হয়েছে। কিন্তু চলতি বছর বন্যার আগে ওই বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এখনই এই বাঁধ টিকাতে না পারলে আসন্ন বন্যায় গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী, বাগডোহরা এবং ভাটিতে কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল, মটুকপুর ও বিনবিনা এলাকার অন্তত ১২ হাজার পরিবারের ঘরবাড়িসহ বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাবে। সে কারণে আতঙ্কে থাকা চরবাসী উপজেলা প্রশাসনসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট থেকে নদীর ওপারের খেয়াঘাট মিনার বাজারের কাছে দাঁড়িয়ে আছে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধ, যার অবস্থান বাগডোহরা এলাকায়। ওপারে যেতে নৌযাত্রীদের সেখানেই নামতে হয়। উজানে চর নোহালী এলাকায় দেখা যায় আরেকটি বাঁধ। বন্যা শুরু না হলেও ভারী বর্ষণে বাঁধ দু’টির মাথায় শুরু হয়েছে ভাঙন। খেয়াঘাটের চায়ের দোকানের ঝুপড়ি ঘরে বসে বাঁধ নিয়েই শঙ্কার কথা বলছিলেন চরের কয়েকজন বাসিন্দা।
এসময় আমজাদ আলী নামের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আমার জন্ম বাগডোহরা এলাকায়। তিস্তার করাল গ্রাসে এ পর্যন্ত ৯ বার বাড়ি ভেঙেছে। বর্তমানে চর বাগডোহরা এলাকার বাসিন্দা হলেও সেখানে থাকা না থাকা নির্ভর করছে এই বাঁধ রক্ষার ওপরেই।’
অন্যদিকে, এই বাঁধ রক্ষার সহায়ক হিসেবে গত বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে উজানে ব্রিফ বাজার থেকে কাচারিপাড়া পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে এলাকাবাসী। ইতোমধ্যে যার অন্তত ২০০ ফুট অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আলহাজ মোতালেব হোসেন জানান, এই বাঁধ না টিকলে ভাটিতে বাগডোহরা এলাকার বাঁধও টিকবে না। পরিণতিতে চরের অন্তত পাঁচটি গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
সুরুজ মিয়া ও লেবু মিয়ার আকুতি, ‘নিজেদের টাকায় নিজেরা বাঁধ নির্মাণ করি দেওয়ালে পিঠ ঠেকি গেইছে। এ্যালা চোখের সামনোত সেই বাঁধ ভাঙি যায়, হামার কিচ্চু করার নাই। বাঁধ রক্ষায় সবার সাহায্য দরকার।’
এলাকার বাসিন্দা ও নোহালী ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মশিয়ার রহমান জানান, এই বাঁধ রক্ষা করতে না পারলে বাগডোহরা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ভাটিতে নির্মিত বাঁধও টিকবে না, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ব্যাপক এলাকা। এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের ভাষ্য, এই মুহূর্তে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু করার নেই। তবে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাঁধ রক্ষায় ইতোমধ্যে কিছু জিও ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।



