বাবাকে খুন করল ছেলে, রক্তের দাগ মুছেও মা-সহ ধরা

সংগৃহীত ছবি
গভীর রাতে মা-বাবা ঝগড়া করছিলেন। বিরক্ত ছেলে বাবাকে ঘরের ভেতর কুপিয়ে আহত করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাবা আলমগীর। সন্তানকে রক্ষায় ঘরে ছড়িয়ে থাকা রক্তের দাগ দ্রুত পরিষ্কার করেন মা। এরপর প্রচার করেন, ঘরের বাইরে রাতের আঁধারে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তের হাতে আহত হয়েছেন তার স্বামী।
পুলিশের ভাষ্য, ঘরের ভেতরে-বাইরে কোথাও রক্তের সামান্য দাগ না দেখে সন্দেহ জাগে তাদের। এরপর ‘হালকা টোকা’ দিয়েই বের করে ফেলেন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য।
খুনের ঘটনাটি ঘটেছে তিনদিন আগে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উত্তর পদুয়া কামারটিলা গ্রামে। আজ শুক্রবার মা-ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি প্রকাশ করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন রহিমা বেগম (৩৫) ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রাকিব (২০)।
গত বুধবার আহত মো. আলমগীর (৫০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি প্রায় ১৯ বছর প্রবাসে থেকে গত বছরের অক্টোবরে দেশে ফেরেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলমগীর ২০০৫ সালে রহিমাকে বিয়ে করেন। তাদের দুই ছেলে। ২০০৭ সালে আলমগীর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিষয়টি মানতে না পেরে রহিমা দুই ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে যান। ওই বছরই বিদেশে চলে যান আলমগীর। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে তালাক দেন।
গত ১৯ বছরে আলমগীর কয়েকবার দেশে এসে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন বলে জানালেন দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ হিলাল উদ্দীন আহমেদ।
ওসির ভাষ্য, ‘রহিমা আলমগীরকে ছেড়ে শহরে গিয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। দেশে ফিরে আলমগীর তাকে চাকরি ছাড়িয়ে দুই ছেলেসহ গ্রামের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু তিনি তার স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সবসময় সন্দেহ করতেন। প্রায়ই স্ত্রীর মোবাইল চেক করতেন।’
'গত মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে মোবাইল চেক করা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলে পাশের কক্ষ থেকে ছেলে গিয়ে বাবার মাথায় দা দিয়ে আঘাত করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় আলমগীর লুটিয়ে পড়েন।' এরপর মা-ছেলে মিলে লাশ ঘরের বাইরে রেখে প্রতিবেশীদের ডাকেন।
পুলিশের তথ্য, প্রতিবেশীদের ডাকার আগে তারা ঘরের ভেতর জমে থাকা রক্ত পরিস্কার করেন। রহিমা প্রতিবেশিদের জানান, তার স্বামী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ঘরের বাইরে বের হয়েছিলেন। এ সময় তাকে কে বা কারা কুপিয়ে ফেলে গেছে। রহিমা ও রবিউলসহ প্রতিবেশী কয়েকজন মিলে আলমগীরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বুধবার দুপুরে তিনি মারা যান।
‘ময়নাতদন্ত ছাড়াই মা-ছেলে হাসাপাতাল থেকে আলমগীরের লাশ নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। মেডিক্যাল ফাঁড়ির পুলিশের কাছ থেকেই আমরা প্রথমে ঘটনার তথ্য পাই। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেই লাশ পরিবারকে দেওয়া হয়। বুধবার রাতে আমরা ঘটনাস্থলে যাই’— যোগ করেন ওসি হিলাল।
রহিমা ও তার ছেলে আমাদের যে ঘটনাস্থল দেখালেন সেখানে রক্তের সামান্যতম দাগ কিংবা কোনো আলামত ছিল না। রহিমার দাবি, বৃষ্টির পানিতে রক্তের দাগ ধুয়ে গেছে। ঘরের ভেতরেও কোনো আলামত দেখা গেল না। এতে আমাদের সন্দেহ হয়। কারণ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণের তথ্য পেয়েছিলাম। বৃহস্পতিবারও আমরা এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করি— জানান ওসি।
রাতে রহিমা ও রবিউলকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন বলে জানালেন ওসি হিলাল উদ্দীন, ‘তাদের তথ্যেই ঘরে লুকানো দা আমরা উদ্ধার করেছি। সেটা দিয়েই রবিউল তার বাবাকে খুন করেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়।’
আজ বিকেলে মা-ছেলে দুজনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে ওসি জানান।



