কাচ কারখানা বন্ধ করে চালু করতে সময় লাগবে দেড় বছর, খরচ ৫০০ কোটি টাকা
- প্রযুক্তির কাছে মানবজাতির আত্মসমর্পণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মে দিবস মানেই শ্রমিকদের অধিকারের দিন। বন্ধ কলকারখানা। ছুটির সঙ্গে র্যালি, সমাবেশ, আলোচনা, সংগীত। ১৩৭ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী চলছে এ রেওয়াজ। কিন্তু যুগের সঙ্গে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে কলকারখানার কাজের ধরন। শ্রমিকদের কর্মব্যস্ত দিনলিপিও। এখানেই প্রযুক্তি প্রধান হয়ে উঠছে।
মে দিবসেও ঘুরছে মেশিনের চাকা, বের হচ্ছে ব্যবহারযোগ্য তৈরি পণ্য। চাইলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না কারখানা। ছুটি মিলছে না শ্রমিকেরও। প্রযুক্তির কাছে এভাবেই আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে এখন। কী সেই প্রযুক্তি বা কারখানা? বালু থেকে কাচ তৈরির কাহিনি শুনেছেন? সেই কাচ কারখানা শ্রমিক দিবস বলেন, ঈদ-পূজা-পার্বণ— কোনো কিছুতেই বন্ধ করা যায় না। ঘূর্ণিঝড়, দুর্বিপাক, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কাঁচামালের সংকট— এসব থিউরি অচল এ কারখানায়। আর যদি বন্ধই করতে হয় তাহলে চালু করতে সময় লাগবে দেড় বছর। খরচের অঙ্ক শুনবেন, ৫০০ কোটি টাকা! ঢাকা-চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ড এলাকায় ২০০৫ সালের ২৩ জুন এরকম একটি কাচ কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
দেশের নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলির মালিকানাধীন কারখানাটি ৩০ একর জায়গার ওপর। চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত গত ২১ বছরে এই কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে মাত্র একবার। ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। কাচ কারখানার এ কোল্ড রিপেয়ারিংয়ের পরিভাষা হলো ‘ক্যাম্পেইন’। এত দীর্ঘ সময় ধরে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করার কারণ অনেক। কাচ তৈরি করা হয় লাইমস্টোন, সিলিকন বালু, সোডা অ্যাশ, সল্ট কেক, ডোলোমাইট ও কোল পাউডার দিয়ে। ১৬০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তৈরি হয় কাচ। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে কারখানা বন্ধ হলে ফার্নেস জমাট বেঁধে লোহার মতো কঠিন হয়ে যায়। সেই লোহা কাটতেই লাগে ছয় মাস। অন্যান্য মেরামতের কাজ করতে সময় লাগে আরও বছরখানেক। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রয়োগ করা লাগে। পুনরায় সচল করতে সময়ের সঙ্গে দরকার হয় বিপুল অঙ্কের টাকাও। এ জটিল অথচ আধুনিক কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ হলেন পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সোহেল।
তিনি জানালেন, প্রতিদিন ৩০০ টন ধারণক্ষমতার একটি কারখানায় বিনিয়োগ লাগে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ইউরোপিয়ান-চায়নিজ ‘লুই ইয়ং’ প্রযুক্তির এ কারখানায় তিন শিফটে দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করে। চাইলেই যখন-তখন বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়া যায় না। উচ্চপ্রযুক্তির এ কারখানা এমন এক ধারণা যে, প্রযুক্তির কাছে সৃজনশীল মানবজাতির আত্মসমর্পণ।
মজার ব্যাপার হলো, এ কারখানার জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ, জেনারেটরসহ প্রত্যেক জিনিসের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হয় তিনগুণের সমান। যেমন— একটি মোটরের জন্য তিনটি বিকল্প মোটর রাখতে হয়। জেনারেটরের ক্ষেত্রেও একই। কারখানা চালু থাকলেও ১ মে-তে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য পেয়ে যান। ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা লাগে এক দিনের জন্য।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে ১৮৮৯ সাল থেকে। এ ঘটনার পটভূমি তৈরি হয় ১৮৮৬ সালের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের ধর্মঘট শুরু করে শ্রমিকরা। আন্দোলন তীব্র হয়ে ৪ মে হে মার্কেটে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হয়। বিচারহীনভাবে ফাঁসি দেওয়া হয় কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে। বিশ্ব জুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার স্মরণে দুই বছর পর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে পালিত হচ্ছে এই মে দিবস। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ছুটি বাধ্যতামূলক এই দিনে।
মে দিবসের ছুটি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত বললেন, ‘কারখানা চালু রাখা যাবে সবেতনে। ওইদিনের জন্য এর সঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী বাড়তি সুবিধাও দিতে হবে যারা কাজ করেন। কাচ কারখানার উৎপাদনের ধরন আমার জানা নেই। জেনে নিয়ে বলতে পারব। কাচ কারখানা সুবিধা নিশ্চিত করলে সেটি একটি ভালো উদাহরণ।’



