বাজারের উত্তাপ ডিসি সম্মেলনে
- ১৪ লাখে ১০ লাখকেই রেশন দেওয়ার প্রস্তাব!
- বেতনের টাকায় চলে না সংসার
- জীবনযাপনে টানাপড়েন
- কর্মচারীদের জন্য ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষার দাবি
- আমলামন ভিজেছে কৃষকের কান্নায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নিত্যদিন মাথা কুটেন আমজনতা। তখন পাত্তা দেন না সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু তারাই যখন তোলেন, ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে জীবনযাত্রা, তখন ভাবনার বিষয়। সেটি জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলার হলে— চিন্তার ভাঁজ ফেলে কপালে। আর যদি প্রধানমন্ত্রীর সামনে ওঠে— তা দুশ্চিন্তা বাড়ায়। সেটাই হতে যাচ্ছে এবারের ডিসি সম্মেলনে, যা শুরুর কথা রবিবার। ডিসিরা নিজেদের কথা বলবেন রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানরা ছাড়াও সব মন্ত্রীর সঙ্গে— চার দিনের ২৮ অধিবেশনে।
এই আমলা সম্মেলন সামনে রেখেই রেশন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পিরোজপুরের ডিসি। মাঠ প্রশাসনের এই কর্মকর্তার যুক্তি— মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন ব্যয়ে জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে ব্যয়বহুল। ধারদেনা ও ঋণে বাড়ছে মানসিক চাপ। ফলে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটছে। রেশন চালু হলে চাপ কমে, জীবনযাত্রা হবে সহজ। মনোযোগ বাড়বে সরকারি দায়িত্বে।
ডিসি ১২ থেকে ২০ গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্য দিয়েছেন এ প্রস্তাব। এখানেই সবচেয়ে বেশি কর্মচারী। সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা দেয় জনপ্রশাসনের পরিসংখ্যান। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব পাবলিক সার্ভেন্ট-২০২৪’ দেখাচ্ছে— সাড়ে ১৪ লাখ মোট কর্মচারীর মধ্যে এই আট গ্রেডেই ১০ লাখ ৩৫ হাজার! অর্থাৎ ৭১ শতাংশ কর্মচারী রেশন নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।
সরকারের ২০টি বেতন গ্রেড। ১ নম্বর গ্রেডে সচিব, ২ নম্বরে অতিরিক্ত সচিব, ৩-এ যুগ্ম, ৪-এ উপসচিব। ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেলায় জেলায় এই উপসচিবরাই।
রেশন সুবিধার প্রস্তাব এসেছে বান্দরবান ও রাঙামাটির ডিসিদের কাছ থেকেও। তাদের মত, ‘রেশন সুবিধা দিলে কাজের আগ্রহ ও সেবার মান বাড়বে।’
বাজারের উত্তাপ ডিসি সম্মেলনে উঠবে নানা দিক থেকে। ডিসিদের প্রস্তাবগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ধরে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চ্যাপ্টারে ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্যের দুরবস্থা। তেমনি রয়েছে শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, খাদ্য, বাসস্থানসহ বিষয়ভিত্তিক প্রস্তাব
ইস্যুটি কেন কপালে ভাঁজ ফেলবে? তিন কারণে। প্রথম ও বড় কারণ হলো— এই দাবি জানাতে গিয়ে জেল খেটেছেন সচিবালয়ের কর্মচারীদের নেতা বাদিউল কবীর। দ্বিতীয় কারণ— ১০ বছর ধরে তাদের বেতন বাড়েনি। অন্তর্বর্তীরা কমিশন করে সুপারিশ নিয়ে তা পাসও করে গেছেন। নতুন সরকার তা আটকে রেখেছে অর্থনীতির নাজুক অবস্থার দোহাই দিয়ে। আর তৃতীয় কারণ হলো সবচেয়ে বড়— জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক বাড়ায় কঠিন হয়েছে জীবনযাপন; এটাতে সায় সাধারণ মানুষেরও।
চর এলাকার জীবনযাপন কতটা কঠিন— তা উঠেছে কুড়িগ্রামের ডিসির প্রস্তাবে। তার মত, ‘চর এলাকায় জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল।’ ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঝুঁকিতে সেখানে অবস্থানে নিরুৎসাহিত চাকরিজীবীরা। কুড়িগ্রামের ডিসির প্রস্তাব চর ভাতা চালুর, অর্থাৎ তারা ভাতা পেলে সেখানে শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ নিশ্চিত হবে সরকারি সেবার মান। সুবিধাভোগী হয়েও চরে কর্মরত শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও অন্যান্য চাকরিজীবীর সমস্যা তুলে ধরেছেন তিনি।
কর্মচারীদের জন্য ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তাব এসেছে কুমিল্লার ডিসির তরফে। তার যুক্তি, মেডিকেল ভাতা হিসেবে তারা যা পান, তা অপ্রতুল। তিনি সরকারি দপ্তরের অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কথাও বলেছেন। সেখানে উঠে এসেছে দপ্তরের অনিয়মিত গাড়িচালকদের কম বেতনের কথাও। ভূমি অফিসের অনিয়মিত গাড়িচালকরা মাসে পান ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। অতিরিক্ত বেতন না থাকায় ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনে অনীহা থাকে তাদের।
বাজারের উত্তাপ ডিসি সম্মেলনে উঠবে নানা দিক থেকে। ডিসিদের প্রস্তাবগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ধরে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চ্যাপ্টারে ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্যের দুরবস্থা। তেমনি রয়েছে শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, খাদ্য, বাসস্থানসহ বিষয়ভিত্তিক প্রস্তাব। সেসব প্রস্তাবে শুধু যে সরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়ই এসেছে, তা নয়। সাধারণের বিষয় বিবেচনা করেই বেশিরভাগ প্রস্তাব।
কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। টাঙ্গাইলের ডিসির আমলামন ভিজেছে কৃষকের কান্নায়
কর্মচারীদের সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার আকুতি রাজবাড়ীর ডিসির প্রস্তাবে। দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের বদলে তার প্রস্তাব স্বাস্থ্যবীমার। ঝুঁকিভিত্তিক বীমা মডেল গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা সুপারিশ তার।
চিকিৎসাসেবায় অগ্রাধিকার রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের। রাজধানীসহ নানা জায়গায় তাদের জন্য আছে নির্ধারিত হাসপাতাল। সাধারণ মানুষের তুলনায় যথেষ্ট রক্ষাকবচ তাদের জন্য। তারপরও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তারা। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দুরবস্থা অনুমান করা যায় সহজেই।
সরকারি হাসপাতালে মেডিকেল টেস্ট ফি নির্ধারিত থাকলেও বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে থাকে না তা। মালিকদের অ্যাসোসিয়েশন নির্ধারণ করে ইচ্ছামতো। এ খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের আর্জি প্রকাশ পেয়েছে মাগুরার ডিসির প্রস্তাবে।
ভোজ্য তেল নিয়ে জটিলতা হয় প্রায়ই। মাঝেমধ্যে উধাও হয়ে যায় বাজার থেকে। বেড়ে যায় দামও। অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে বগুড়ার ডিসি থেকে। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানিতে বিধিনিষেদের প্রস্তাব তার। এতে সরবরাহ বাড়বে। নিয়ন্ত্রণে থাকবে অযৌক্তিক বৃদ্ধির প্রবণতা— দিয়েছেন এমনই যুক্তি।
যখনই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখনই সচল হয় টিসিবি। সেই সংস্থাকে আরও কার্যকরের প্রস্তাব মাগুরার ডিসির দিক থেকে। বর্তমানে ডাল, পেঁয়াজ, চিনির মতো প্রাত্যহিক ব্যবহার্য আরও কিছু জিনিস নিয়ে কারবার। পণ্যের পদ বাড়িয়ে সংস্থাটির কারবারের পরিসর বিস্তৃত করায় নজর তার। এই ডিসির মতে, টিসিবি বাজারে থাকলে বাড়ে প্রতিযোগিতা। নিয়ন্ত্রণে থাকে মূল্যবৃদ্ধি। ভর্তুকি দামে পণ্য পেলে কেনার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে ভোক্তা— এমনটিই যুক্তি দিয়েছেন এই কর্তা।
৪৯৮ প্রস্তাবের মধ্যে একটিতে জীবনযাপন কষ্টসাধ্যের কথা বলেছেন গোপালগঞ্জের ডিসি। তবে সেটি মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিন-ইমামের— তারাও সরকারি সুবিধাভোগী। তাদের অস্থায়ী চাকরি স্থায়ী, সেই সঙ্গে বেতন-ভাতা বাড়ানোর কথা তুলেছেন।
কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। টাঙ্গাইলের ডিসির আমলামন ভিজেছে কৃষকের কান্নায়।



