বিধানসভা নির্বাচন
পশ্চিমবঙ্গে কমছে মুসলিম জনপ্রতিনিধি
- পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যার হার ২৭ শতাংশ
- ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল টিকিট দিয়েছিল ৫৭ জনকে
- এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে
- বিজেপি-তৃণমূলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

এসআইআর বিরোধী বিক্ষোভকারীদের দাবি, যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও অনেক বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে — ফাইল ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ধর্মাবলম্বীর হার মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বিধানসভায় যাওয়ার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিট পেয়েছেন মাত্র ৪৭ জন। অথচ গতবারও ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন ৫৭ জন, যাদের মধ্যে বিজয়ী হয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন ৪২ জন। অর্থাৎ সম্ভাব্যতার সূত্রও যদি ধরি, তাহলে এবার মুসলিম প্রার্থীদের বিজয়ী হয়ে বিধানসভায় যাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে গেল।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়রাই ধারণা করছেন, সম্ভবত এবার ২০০৬ সালের বাম আমলের চেয়েও কম মুসলিম বিধায়ক পেতে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। এবারের প্রার্থী তালিকা এবং নির্বাচনী সমীকরণ আভাস দিচ্ছে— আগামী বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব সম্ভবত গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে।
তাই সবার মতো পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদেরও নজর ৪ মের ফলের দিকে। সেদিন ইভিএম বক্সের ফল স্পষ্ট করবে— কার মাথায় উঠবে বাংলার রাজতিলক। সেইসঙ্গে এটাও জানা যাবে, রাজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষের ঠিক কতজন প্রতিনিধি বিধানসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে বরাবরের মতো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস দিয়েছে ৪৭ জনকে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যাকে তৃণমূলের ভোটব্যাংক হিসেবে ধরা হয়। ফলে অনেক নাগরিকই মনে করছেন, বিজেপির তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের মোকাবিলায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও এবার অনেক বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে।
একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ২০০৬ সালে বাম আমলে বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ছিল ৪৬ জন। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর এই সংখ্যা বাড়ে। ২০১১ সালে ৫৯ জন এবং ২০১৬ সালে ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছিল মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা।
২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসায় লড়াই তীব্র মেরূকরণের রূপ নেয়। ফলে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে দাঁড়ায় ৪২ জনে। যার মধ্যে তৃণমূলের ৪১ জন এবং আইএসএফের একজন, যা ২০০৬ সালের বাম আমলের চেয়েও কম।
২০২৬ সালের নির্বাচনে এ প্রতিনিধিত্বের পথে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে।
যার প্রথম কারণটি হলো, বিজেপি একজনও মুসলিম প্রার্থী রাখেনি। যার ফলে বিজেপি যে যে আসনে জয়ী হবে, সেসব কেন্দ্র থেকে বিধানসভায় কোনো মুসলিম প্রতিনিধির যাওয়ার পথ শুরুতেই রুদ্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও মাত্র ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছে, যা তাদের মোট প্রার্থীর মাত্র ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে এ সংখ্যাটি বেশ নগণ্য।
যেহেতু তৃণমূলই সরকার গড়ার প্রধান দাবিদার, তাই তাদের এই সীমিত প্রার্থী তালিকা মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যার ওপর একটি ‘অদৃশ্য সিলিং’ বা সর্বোচ্চ সীমা টেনে দিয়েছে।
এমনকি তৃণমূলের সব মুসলিম প্রার্থী যদি জয়ীও হন, তবুও বিধানসভায় তাদের মোট সংখ্যা অতীতের গৌরবোজ্জ্বল পরিসংখ্যানকে ছুঁতে পারবে না। একদিকে বিজেপির বর্জননীতি, অন্যদিকে শাসক দলের কৌশলগত সতর্কতা— এই দুয়ের জাঁতাকলে পড়ে বাংলার বিধানসভায় মুসলিম কণ্ঠস্বর ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৪ তারিখের পর।
বুথফেরত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
এবারের নির্বাচন ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক যুদ্ধক্ষেত্র। একদিকে কেন্দ্রে মসনদ রক্ষা ও বাংলা জয়ের মরিয়া লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিজেপি। অন্যদিকে, ১৫ বছরের শাসনকাল পেরিয়েও নিজের দুর্গ অটুট রাখতে জান-পরান দিয়ে লড়তে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থার বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল রিপোর্ট বলছে, দুই শিবিরের মধ্যেই চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
জরিপ অনুযায়ী, তৃণমূল ১৯৫ থেকে ২০৫টি আসন পেতে পারে, যেখানে বিজেপি থেমে যেতে পারে ৮০ থেকে ৯০ আসনেই। পিপলস পালস আবার তৃণমূলকে ১৭৮ থেকে ১৮৯টি আসন দিয়ে এগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, ম্যাট্রিজ এবং চাণক্য স্ট্র্যাটেজিসের মতো সংস্থাগুলো কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
ম্যাট্রিজের মতে, বিজেপি ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, যেখানে তৃণমূল ১২৫ থেকে ১৪০-এ আটকে যাবে। চাণক্যের দাবি আরও জোরালো। তাদের মতে, বিজেপি ১৫০ পার করে ১৬০টি আসন পর্যন্ত দখল করতে পারে। পোল অব এক্সিট পোলস আবার দুই দলের মধ্যে অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যবধান দেখাচ্ছে, যেখানে তৃণমূল ১৪৭ এবং বিজেপি ১৩৭টি আসন পেতে পারে। এই বিচিত্র এবং বিপরীতধর্মী ফলই প্রমাণ করে, বাংলার মানুষের শেষ কথাটি পড়া কোনো সংস্থার পক্ষেই সম্ভব হয়নি।
তবে এ সমীক্ষাগুলো কি শেষ পর্যন্ত মিলবে? অতীতে বহুবার দেখা গেছে, এক্সিট পোলের হিসাব উল্টে দিয়ে মমতা-ম্যাজিক কাজ করেছে। তৃণমূলের প্রচারের মূল হাতিয়ার ছিল ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, যুবসাথী কিংবা স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনমুখী প্রকল্পগুলো বাংলার প্রান্তিক মানুষের জীবনে যে স্বস্তি এনেছে, তা ইভিএমে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিশেষ করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প বাংলার মহিলা ভোটারদের একটি বিশাল অংশকে তৃণমূলের দিকে টেনে আনবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশের ধারণা। বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির বিপরীতে তৃণমূল সাজিয়েছিল উন্নয়ন ও সম্প্রীতির কোলাজ। মোদি-শাহদের মেগা প্রচারের বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত কারিশমা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় সংযোগ আজও এক বড় শক্তি।
বিজেপির মেরূকরণ বনাম তৃণমূলের উন্নয়ন— এ দুই আদর্শের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা সময় বলবে। তবে সমীক্ষা যাই বলুক না কেন, বাংলার মাঠের লড়াই বলছে— ফল অনেক বেশি চমকপ্রদ হতে পারে।




