‘ধানটা লাল হয়ে আসছিল, কাটার সময়ই পাইলাম না’

সংগৃহীত ছবি
‘সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধারদেনা কইরা সার-বীজ, কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ অইবো, আর কেমনে কী করবাম জানি না’— এভাবেই বলছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন।
আকাশের মেঘ যেমন কাটছেই না, সঙ্গে কমছে না হাওরের কৃষকের দুশ্চিন্তা। বরং, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরপ্রধান এলাকায় রয়েছে বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও। বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে হাওর অঞ্চলে।
এবার দেড় কানি (প্রায় ৬০ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করলেও সামান্য পরিমাণ ধান তুলতে পেরেছি। আমাদের পুরো অঞ্চলের চিত্রই প্রায় একই এবং কেউই তাদের পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিদিনই পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে একদিকে প্রায় পাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে, আবার তড়িঘড়ি করে কিছু এলাকায় ধান কাটা হলেও রোদ না থাকায় পচে যাচ্ছে সেইসব ধানও। আবার নদ-নদীর পানিও বাড়ছে বৃষ্টির কারণে। যদিও তা এখনো বিপদসীমায় পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
সুনামগঞ্জের চাষি আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, ‘এবার দেড় কানি (প্রায় ৬০ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করলেও সামান্য পরিমাণ ধানও তুলতে পেরেছি। আমাদের পুরো অঞ্চলের চিত্রই প্রায় একই এবং কেউই তাদের পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। পানিতে তলিয়ে গেছে ধানসহ জমি।’
বেশিরভাগ নদ-নদীর পানিই বেড়েছে। তবে পানি বিপদসীমার নিচে আছে, কিন্তু বাড়ছে। কিছু এলাকায় পানি সরানোর জন্য কেটে দেওয়া হচ্ছে বাঁধ
একই ধরনের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর-খয়েরপুর ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জসিম। ‘হাজার হাজার কানি ক্ষেত এখন পানির তলে। ধানটা লাল হয়ে আসছিল। কমলার মতো রং। সকাল কাজ করে আসলাম, আর দুপুরে গিয়া দেখি পানি। কাটার সময়ই পাইলাম না। পরদিন পুরোটাই তলায়া গেল।’
তিনি বলছিলেন, ‘কেউ কেউ ধান কেটে আনলেও রোদের জন্য স্তূপ করে রাখা সেসব ধান রোদ না থাকায় নষ্ট হতে শুরু করেছে।’
তার ভাষ্য, ‘এক দিনের রইদে (রোদ) এই ধান শুকাইবো না। কিন্তু সেই রইদ-ই তো পাওয়া যাইতাসে না। ওইদিকে আরও বাড়তেছে নদীর পানি।’
সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের মতোই নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও আশপাশের পুরো হাওড় অঞ্চলেরই চিত্রও প্রায়ই একই। এর মধ্যে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলায় ইতোমধ্যেই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সামনে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, সঙ্গে নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
পানিতে নিমজ্জিত জমি বাড়ছে
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলছেন, ‘আজ শনিবারও সেখানে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে এবং সে কারণে দ্রুতগতিতে বাড়ছে পানিতে নিমজ্জিত হওয়া জমির পরিমাণ। এখানে সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হচ্ছে— পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ আজ নাগাদ প্রায় সাত হাজার একর ছাড়িয়ে যাবে। ওদিকে রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে পচে যাচ্ছে উঠানো ধানও। আমরা তাও কৃষকদের বলছি যেখানে সুযোগ আছে সেখানে যেন ধান কেটে ফেলে।’
এর আগে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জে রোদ ওঠার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল বোরো ধান নিয়ে উদ্বেগে থাকা কৃষকদের মধ্যে। ওইদিন ও পরে শুক্রবার বেশ কিছু এলাকায় পাকা ধান কেটেছেন অনেকে। কিন্তু শনিবার আবার থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছেন তারা।
আবার বৃষ্টি কমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পরিমাণও কমে আসছিল। ওই সময় কৃষকদের ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু শুক্রবার রাত থেকেই আবারও বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হওয়ায় এখন যারা ধান কাটেননি আবার যারা কেটে স্তূপ করে রেখেছিলেন, তারা উভয়েই সংকটে পড়েছেন। আজও সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন জায়গায় বজ্রবৃষ্টি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
‘বেশিরভাগ নদ-নদীর পানিই বেড়েছে। তবে পানি বিপদসীমার নিচে আছে, কিন্তু বাড়ছে। কিছু এলাকায় পানি সরানোর জন্য কেটে দেওয়া হচ্ছে বাঁধ’— বলছিলেন কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন।





