বর্ষণে তিস্তায় দেখা মিলছে বৈরালির
- পাহাড় বেয়ে নেমে আসা নদীতে বাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারী বর্ষণে শুকনো তিস্তায় কিছুটা হলেও পানি বেড়েছে। বছরের নতুন পানিতে উজানের দিকে ছুটে চলছে বৈরালি মাছের ঝাঁক। মাছটি দিনের বেলায় গভীর পানিতে সরে গেলেও সাধারণত বিকাল থেকে রাতের দিকে নদীর কিনারে চলে আসে। পানির ওপরের স্তরে চলতে থাকে ঝাঁক বেঁধে। ছোট ছোট চটকা জালে (হাতে টানা জাল) ধরা পড়ে এ মাছ। তাই তিস্তায় এখন ধুম পড়েছে ছেলে-বুড়ো জেলেদের।
জনপ্রিয় ও সুস্বাদু এই মাছের চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। নদীর পাড়ে প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। শহরে নিয়ে গেলেই বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। রুপালি রঙের মাছটির গায়ে থাকে ছোট ছোট আঁশ। পিঠের রঙ হালকা মেটে। পেটের নিচে হলুদ দাগ। মাছটিতে কাঁটা থাকলেও তা বেশ নরম।
মাছটির দ্রুতগতি আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা ইলিশ মাছের মতো। তাই অনেকে মজা করে একে ‘তিস্তার ইলিশ’ বলে থাকে।
‘ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরছি তিস্তায়। আগে প্রচুর বৈরালি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে নদীতে জাল ফেলে সর্বোচ্চ দুই কেজি বৈরালি মাছ ধরা কষ্ট হয়ে যায়। তবে হঠাৎ খুব বৃষ্টি হওয়ায় জালে বেশ বৈরালি ধরা পড়ছে’
নদীপাড়ের জেলেরা জানান, বৈরালি মূলত তিস্তা নদীর মাছ। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিশেষ করে গত চার বছর সুস্বাদু এই মাছটি জেলেদের জালে তেমন ধরা পড়ছিল না। নদীতে আগের মতো পানি না থাকায় বৈরালি মাছের বংশবৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটছে। আবার যখন ঘোলা পানি আসে নদীতে, তখন বৈরালি মাছও গভীর পানিতে হারিয়ে যায়। কয়েক দিন ধরে রংপুরে আকাশ অন্ধকার করে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আর এতে দেখা মিলছে বৈরালি মাছের।
রংপুরের মহিপুর সেতু এলাকায় দেখা যায়, নদীর কিনারে অনেক জেলে। তাদের জালে উঠছে রুপালি ছোট-বড় বৈরালি মাছ। ক্রেতারাও রয়েছেন জেলেদের আশপাশেই। জয়রাম ওঝা চরের মৎস্যজীবী জোবেদ আলী বলছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরছি তিস্তায়। আগে প্রচুর বৈরালি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে নদীতে জাল ফেলে সর্বোচ্চ দুই কেজি বৈরালি মাছ ধরা কষ্ট হয়ে যায়। তবে হঠাৎ খুব বৃষ্টি হওয়ায় জালে বেশ বৈরালি ধরা পড়ছে।’
তিনি জানান, শনিবার সকালে দুই কেজি মাছ বিক্রি করেছেন ৫০০ টাকা কেজি দরে। আরেক মৎস্যজীবী চর ছালাপাক এলাকার নয়ন মিয়া বলছিলেন, মাছ ব্যবসায়ীরা এখান থেকে বৈরালি মাছ কিনে রংপুর শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। পাশের কাকিনা এলাকা থেকে মাছ কিনতে আসেন লোকমান হোসেন। ‘বাজারে এখন বৈরালি মাছ তেমন চোখে পড়ে না। সামান্য কিছু উঠলেও দাম থাকে চড়া। এ মাছ এখন সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতার বাইরে। খবর পেয়ে মাছ কিনতে তাই নদীর পাড়ে এসেছি’, বলছিলেন তিনি।
নদীর পাড়ে প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। শহরে নিয়ে গেলেই বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়
লালমনিরহাট-রংপুর সড়কের মহিপুর হাইস্কুলের সামনে পলিথিন বিছিয়ে জালে ধরা চকচকে বৈরালি মাছ বিক্রি করছিলেন আমিনুল ইসলাম। লোকজন গাড়ি থামিয়ে কিনছিলেন। আমিনুল জানান, প্রতিদিনই এখানে মাছ বিক্রি করেন। তবে অনেক দিন ধরে জেলেরা বৈরালি মাছ দিতে পারেন না। দুদিন ধরে তাদের জালে ধরা পড়ছে কিছু বৈরালি। সাইজ অনুযায়ী কেজি বিক্রি করছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বৈরালি স্বচ্ছ মিঠাপানির মাছ। রংপুর অঞ্চলে খুব জনপ্রিয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাছটির প্রজননকাল ও বেড়ে ওঠার সময়। এটি ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা এবং ওজন ৪০-৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। মূলত পাহাড় বেয়ে নেমে আসা নদী তিস্তা-ধরলায় এ মাছ পাওয়া যায়। ব্রহ্মপুত্রের কিছু অংশে এই মাছ মেলে। বিশেষ করে তিস্তা ব্যারাজ এলাকা, রংপুরের গঙ্গাচড়া এবং কাউনিয়ায় বৈরালি মাছ পাওয়া যায়। তবে শুকনো মৌসুমে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি না থাকাসহ জেলেরা জাল দিয়ে পোনা শিকার করায় কমে গেছে বৈরালির প্রজনন।
এখন বৈরালি ধরা পড়ায় জেলেদের মধ্যে খুশিরছটা দেখা গেলেও রংপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বদরুজ্জামান মানিক দিয়েছেন সতর্কবার্তা। তিনি বলছিলেন, এখন বৈরালি মাছের প্রজননকাল। এ সময়ে নদী থেকে প্রতিদিন বৈরালির পোনা শিকার করছেন জেলেরা। এই পোনা মিলছে স্থানীয় হাটবাজারে, যা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৪০০ টাকায়। এপ্রিলে এসব পোনা বড় হয়। মে-জুনে ওজন বাড়ে; তখন মাছ ধরে লাভবান হতে পারতেন জেলেরা।
প্রজননকালে জাল দিয়ে বৈরালির পোনা না ধরার জন্য মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।




