অবহেলার ক্ষমতা ও অসহায়ের নিরন্তর মৃত্যুযাত্রা

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে জন্মের পর বড় হয়ে আমাদের নানান অপঘাতে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হয়। নিরাপদে নিজের শতচেষ্টার পরও বেঁচে থাকাটা এখানে একটা বড় বিস্ময়! এই দেশের মানুষ লড়াই আর ধৈর্যে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বিরল ক্ষমতা অর্জন করেছে। তবুও এই দেশের মানুষ এত অনিরাপদ; তাদের জীবন এতটা সহজ ও বিস্তৃত সব কারণ-কায়দায় বরণ করে নেয় মৃত্যু। ছোট শিশুরা তাদের মা-বাবার জন্য শ্রেষ্ঠ জিনিস। একজন সন্তানের জন্য মা-বাবা সব যন্ত্রণা ভোগ করেও আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুর মধ্যেই সংগ্রামী মানুষ তেমন গভীর আনন্দ খুঁজে পায় না, যেমনটা পায় সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তে তার পাশে থেকে। সন্তানের হাসি, প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা— এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই মা-বাবার জীবনের গভীরতম তৃপ্তি। অথচ এত স্নেহ-আদরে বেড়ে ওঠা সেই শিশুটি যখন এখনো চারপাশের ভালোবাসা পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের শোকই নয়— বরং আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার নির্মম প্রকাশ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশ এখনো শিশুসহ সাধারণ মানুষের জন্য কতটা অনিরাপদ রয়ে গেছে।
হামে দেশ জুড়ে আক্রান্ত হচ্ছে ছোট শিশুরা এবং মারা যাচ্ছে। ছোটদের এই মৃত্যুগুলোও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মতো। এসব যেন হত্যা ও মৃত্যুর মাঝখানে দণ্ডায়মান কোনো নির্মমতা। কিছুক্ষেত্রে এই মৃতগুলো কাঠামোগত হত্যা। কিছু মানুষ রাষ্ট্রের অবহেলায় কত সহজে মরে যেতে পারে: কত ক্ষমতা এই অবহেলার; এই অবহেলা কত নির্মম; কত অসহায় কিছু মানুষ ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের কাছে! এই মৃত্যুগুলো আবার আমাদের ব্যবস্থাগুলোর ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবস্থার চিত্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীই এই মরণরূপী হত্যার শিকার হচ্ছে। সেখানে আমাদের পশু ও প্রকৃতিও যেন নিরীহ মানুষের মতো। সম্প্রতি বাগেরহাটে খান জাহান আলীর মাজারসংলগ্ন একটি কুকুরের মর্মান্তিক মৃত্যু নির্মমভাবে তুলে ধরেছে সেই বাস্তবতা।
কত সহজে আমরা হত্যাকে মৃত্যু বানিয়ে ফেলি! একটা পরিবারের ১৩ জন একসঙ্গে সড়কে প্রাণ হারালেন। আমাদের কাছে তবু কিছু হত্যা স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়ে যায়; কিছু মানুষ যেন হত্যাযোগ্য হয়েই বাঁচে-মরে। সেই কবে থেকে আমরা মৃত্যুকেও শ্রেণিকরণ করে ফেলেছি! অথচ সব মানুষ, সব মরণ এক হওয়ার কথা ছিল! কী নির্মম আমাদের বিভাজনের এই জীবন ব্যবস্থা! এমন আয়োজন করে হত্যা আর কোথাও কি হয়? কত সস্তা আমার, আপনার ও আমাদের প্রিয় স্বজনদের জীবন! আমাদের রাস্তায়, নদীতে, পাহাড়ে রক্তের দাগ শুকোয় না। আমাদের শোক পুরনো হওয়ার আগেই নতুন করে হত্যা আয়োজন করে হানা দেয়। বাগেরহাট, সায়েদাবাদ, কিংবা কুমিল্লার রক্তের দাগ শুকানোর আগেই আবার এই বীভৎস হত্যা! আগুনে, পানিতে, পাহাড়ে, হাসপাতালে, বাড়িতে কিংবা গাড়িতে, বাজারে কিংবা সড়কে কত খানে মানুষ মারা যায় আমাদের দেশে। কত সহজে মারা যায় তাজা মানুষ।
ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তার গ্রন্থ Homo Sacer : Sovereign Power and Bare Life (১৯৯৫)-এ বলেন, homo sacer হলো এমন এক মানুষ— যাকে হত্যা করা যায়, কিন্তু সেই হত্যাকে আইনত ‘খুন’ হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং তাকে গণ্য করা হয় না ধর্মীয় বলিদান হিসেবেও।
আগমবেনের তত্ত্বের প্রথম অংশ আমাদের নিত্যদিনের অপঘাত, রোগ ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। জীবনের এই অবস্থাকে তিনি বলেন ‘bare life’ (মূল্যহীন জীবন)— একটি জীবন, যা কেবল জৈবিক অস্তিত্বে সীমাবদ্ধ, কিন্তু রাজনৈতিক/নৈতিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।
হামের টিকা না দেওয়ায় শিশুদের নির্মম মৃত্যু— সড়ক দুর্ঘটনা, অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা— Agamben-এর ভাষায় এগুলোকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়। এই অবস্থায় দরিদ্র শিশুরা হয়ে ওঠে homo sacer— তারা বেঁচে আছে, কিন্তু সুরক্ষাহীন তাদের জীবন। তাদের মৃত্যু শোকের বিষয় হলেও রাষ্ট্রের দায়ে রূপান্তরিত হয় না।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীই এই হত্যাযোগ্য ও মূল্যহীন জীবনের সহজ শিকারে পরিণত হয়। Agamben-এর তত্ত্ব অনুযায়ী সার্বভৌম ক্ষমতা (রাষ্ট্র, নীতি, অর্থনৈতিক কাঠামো) কিছু মানুষকে ‘পূর্ণ নাগরিক’ হিসেবে রক্ষা করে কিন্তু অন্যদের ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় bare life-এর দিকে। নিরাপদ রাস্তা বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাব, শিশুদের জন্য সুরক্ষা নীতির দুর্বলতা, শ্রম, বাসস্থান, পরিবেশগত ঝুঁকি দরিদ্র মানুষদের জন্য প্রতিদিনের মৃত্যু ফাঁদ তৈরি করে রাখে। কিন্তু ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী শ্রেণি দেশ ও বিদেশের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। রাজনীতি, আইন ও আর্থিক কাঠামো সবকিছু তাদের অত্যধিক সুরক্ষা দেয় অতি সহজে।ফলে দরিদ্রদের জীবন ‘কম মূল্যবান’ হয়ে ওঠে—আইনগতভাবে না হলেও বাস্তবতায়। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন কিছু জীবনকে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না, মৃত্যুগুলো নিয়মিত, পূর্বানুমেয়, কিন্তু প্রতিরোধহীন হয়ে পড়ে। দায় কারও ওপর স্পষ্টভাবে বর্তায় না। মানুষ কেবল শোকযোগ্য বস্তুতে পরিণত হয়।
পশু ও প্রকৃতি যেন এই মূল্যহীন ও হত্যাযোগ্য জীবনের বিস্তৃত অংশ। পশুর জীবন তো আইনগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই কম সুরক্ষিত। কিন্তু যখন সমাজ নিরীহ প্রাণীর প্রতিও সহিংস হয়, তখন তা মানুষের ক্ষেত্রেও একই মনস্তত্ত্বকে প্রতিফলিত করে।
Agamben সরাসরি প্রাণীদের নিয়ে homo sacer বলেননি, কিন্তু তার ধারণা প্রসারিত করলে দেখা যায়: কিছু জীবন ‘killable’ বা হত্যাযোগ্য কিন্তু ‘grievable’ (শোকযোগ্য) কিছু নয়। পশু ও প্রকৃতি প্রায়ই সেই হত্যাযোগ্য ও ‘অশোকযোগ্য’ জীবনের অংশ।ফলে তারাও এক ধরনের bare life—যাদের মৃত্যু স্বাভাবিক ও অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখা হয়।
লৌকিক সমাজের যে কেউ পশু ও প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণ করতে পারার অধিকার বোধ করে যা আমাদের সমাজের শোষণপ্রিয় নীতি-কানুন ও অসহায় মানুষদের সুরক্ষার অভাবের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সম্প্রতি বাগেরহাটে কুমিরের হিংস্রতার মুখে একটা কুকুরের অসহায় হত্যা যেন আমাদের সমাজের সহজ বাস্তবতা। এমন কুমিরের রূপে আমাদের চারপাশের ব্যবস্থা ও আইনকানুন এবং শোষকশ্রেণি বিরাজ করছে। আমরা চেয়ে দেখছি অসহায় হয়ে চুপ থাকছি কিংবা শোক প্রকাশ করছি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাচ্ছি প্রতিক্রিয়া। কিছুদিন আগেও কুকুর নিধন দেখেছি কিছু শহরে আবার দেখেছি কুকুরের বাচ্চাকে বস্তাবন্দি করে পানিতে ডুবিয়ে মেরে ফেলার ঘটনাও। সেখানে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিন্তু আমাদের বিবেকের মধ্যে বৃহত্তর জীবনের জন্য দরদ না জন্মালে এবং ন্যায়বোধের চর্চা সমাজের সবার মধ্যে সমান সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে মানুষ অন্য মানুষ, এমনকি পশুকেও রক্ষা করতে দরদ দেখাবে না। প্রতিপক্ষ বানাবে চরপাশটাকে। বেশি গতি, বেশি যাত্রী, বেশি মুনাফা লাভের আশায় মানুষ কেবল কম দামি হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রের কাছেও মানুষ কেবল ভোটার। তাদের জীবনের বলিদানেই ক্ষমতা নিশ্চিত হয় কিন্তু তারা বছর জুড়ে, আমল জুড়ে, যুগ যুগ ধরে হত্যাযোগ্য হয়েই বেঁচে থাকেন।
লেখক: শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ,
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং
পিএইচডি গবেষক, কার্টিন
ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া



