কেরালায় ফিরছে ‘পালাবদল রাজনীতি’, নাকি টিকবে এলডিএফ?

সংগৃহীত ছবি
ভারতের কেরালা রাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও জল্পনার মূল উৎস রাজ্যটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারা। ৯ এপ্রিল এক দফায় ১৪০টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪ মে ফল ঘোষণার অপেক্ষায় রাজ্যের রাজনীতি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
কেরালার নির্বাচনী ইতিহাস দীর্ঘ সময় ধরে একটি সুস্পষ্ট ‘পালাবদল’ প্রবণতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৮০-এর দশক থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় চার দশক ধরে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) এবং ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) পর্যায়ক্রমে এসেছে ক্ষমতায়। ভোটাররা সচেতনভাবে প্রতি পাঁচ বছরে সরকার পরিবর্তন করতেন, যা এক ধরনের রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করত। এই ধারাটি ২০২১ সালে ভেঙে যায়, যখন পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে এলডিএফ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে এবং ৯৯টি আসনে জয়ী হয়ে সৃষ্টি করে ইতিহাস।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কেরালা কি আবার ঐতিহ্যগত পালাবদলের ধারায় ফিরে যাবে, নাকি ২০২১ সালের ব্যতিক্রমই নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠবে?
কী বলছে বুথফেরত জরিপ
কেরালার বুথফেরত জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবারের নির্বাচন খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। বেশিরভাগ জরিপে ইউডিএফকে সামান্য এগিয়ে দেখা হলেও এলডিএফ খুব কাছাকাছি রয়েছে, ফলে ফলাফল হাড্ডাহাড্ডি হওয়ার সম্ভাবনা। বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট— কিছু জরিপ ইউডিএফের স্পষ্ট জয় দেখালেও অন্যগুলো এলডিএফের পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মোটের ওপর, অনেক জরিপেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সরকারের জন্য ধাক্কার পূর্বাভাস এবং ইউডিএফের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বিজেপির উপস্থিতি সীমিত থাকলেও কিছু জরিপে দেখানো হয়েছে তাদের উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়ার সম্ভাবনাও।
সাম্প্রতিক ইতিহাস কী বলছে
কেরালার ভোটার আচরণ বোঝার জন্য সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইউডিএফ ২০টির মধ্যে ১৯টি আসনে জয়ী হলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় সংস্থা নির্বাচনে বিপরীত ফল এনে দেয় এলডিএফ। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এলডিএফের জোরালো জয় প্রমাণ করে যে, কেরালার ভোটাররা একেকটি নির্বাচনকে বিবেচনা করেন আলাদা প্রেক্ষাপটে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের অগ্রাধিকার নির্বাচনভেদে বদলে যায়। জাতীয় রাজনীতিতে এক ধরনের ভোটের ধারা দেখা গেলেও, রাজ্য বা স্থানীয় পর্যায়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় রাজ্য সরকারের কল্যাণমূলক কার্যক্রম, যেমন বিনামূল্যের রেশন ও সহায়তা, ভোটারদের সিদ্ধান্তে ফেলেছিল বড় প্রভাব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নেতৃত্ব। এলডিএফ একটি শক্তিশালী ও স্পষ্ট নেতৃত্ব তুলে ধরতে পেরেছিল, যেখানে বিরোধীরা তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। আধুনিক রাজনীতিতে ‘গল্প বলার ক্ষমতা’ এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটের ফল নির্ধারণে।
সব মিলিয়ে, কেরালার এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া। প্রশ্নটি হলো রাজ্যের ভোটাররা কি আবার পুরনো দোলক রাজনীতিতে ফিরবেন, নাকি পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন ধারা স্থায়ী রূপ নেবে। ৪ মে ফলাফল নির্ধারক হয়ে উঠবে সেই প্রশ্নেরই।




