কচুরিপানায় ঢাকা তিতাস নদী, সংকটে জীববৈচিত্র্য ও জনজীবন

ছবি: আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী কচুরিপানার অস্বাভাবিক বিস্তারে মারাত্মক সংকটে পড়েছে। নদীর বিস্তীর্ণ অংশ ঢেকে যাওয়ায় স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, কমে যাচ্ছে মৎস্যসম্পদ এবং বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নৌচলাচল। এতে নদীর পূর্ব পাড়ের দুটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়দের খেয়া পারাপারের মাধ্যমেই শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুইই বাড়ছে।
স্থানীয় সীতানগর গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়লাল দাস বলেছেন, আগে এই নদীতে সারা বছর পানি থাকত এবং নৌকা চলাচল করত। এখন নদী কচুরিপানায় ঢেকে গেছে, মাছও কমে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, খেয়া পারাপারে প্রতিদিন প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদীতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জমা হওয়ায় কচুরিপানা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর উৎস হিসেবে অপরিশোধিত বর্জ্য, কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ধুয়ে আসা পানি এবং আশপাশের বসতবাড়ির বর্জ্যকে দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া পৌর এলাকার খালগুলো দিয়ে আসা বর্জ্যও নদীতে মিশছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিকে ইউট্রোফিকেশন বলা হয়, যা পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং কচুরিপানার বিস্তার বাড়িয়ে দেয়।
স্থানীয় অভিযোগ, নদীর তীর দখল ও অবৈধ ভরাটের কারণে নদীর প্রশস্ততা কমে গেছে। এতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক জায়গায় নদী এখন খালের মতো হয়ে গেছে।
কচুরিপানার ঘন আবরণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা মাছসহ জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, গত কয়েক বছরে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নদীর অনেক অংশে কচুরিপানা এতটাই ঘন যে ছোট নৌকাও চলাচল করতে পারছে না। এতে স্থানীয়দের দৈনন্দিন যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত কচুরিপানা অপসারণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল মিলছে না।
তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ মন্তব্য করেন, এই সংকট মোকাবেলায় নদী খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তিনি বললেন, বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা, কৃষিতে সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নদী দখলমুক্ত করা এবং নিয়মিত কচুরিপানা অপসারণ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ ২৬ এপ্রিল জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় পৌরসভার বর্জ্য নদীতে না ফেলার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পৌর প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, তিতাস নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে নদীটি ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায়।



