শ্রমিক দিবস
ঘামের গন্ধে লুকানো এক অদৃশ্য মর্যাদা
- শ্রমিকের অধিকার, ঈমানের দাবি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোর এখনো পুরোপুরি ফোটেনি। শহরের আলো নিভে যাওয়ার আগেই কোনো একজন অপূর্ণ ঘুম ভেঙে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে তোলেন।
হাত-মুখ ধুয়ে, পুরোনো একটি শার্ট
গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তার হাতে কোনো ব্রিফকেস নেই, নেই কোনো পরিচয়পত্র ঝোলানো ফিতে। আছে শুধু একজোড়া খসখসে হাত; যার ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে জীবনের দায়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে
সে ভাবছেন, আজ কাজটা পাব তো?
ঘরে যে
শিশুটি গতকাল বলেছিল, ‘আব্বু, কাল আমার জন্য একটা খাতা আনবা কিন্তু...’ সেই মুখটি তার মনে
বারবার ভেসে ওঠে। আর শঙ্কিত মনে ভাবেন,
পারব তো
সন্ধ্যায় সন্তানের আবদার পূরণ করে ঘরে ফিরতে...?
এই মানুষটির পরিচয় সমাজের চোখে খুব ছোট; সে একজন শ্রমিক। কিন্তু ইসলামের চোখে?
ঠিক এই প্রশ্নটির উত্তর খুজবো আজ আমরা।
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে পেশার ভিত্তিতে ভাগ করে না; বরং নিয়ত, সততা ও পরিশ্রমের উপর দাঁড় করায়। যে মানুষটি দিনের পর দিন নিজের ঘাম ঝরিয়ে হালাল রিজিক উপার্জন করে, সে কেবল নিজের পরিবার চালায় না; সে আল্লাহর একটি নির্দেশ পালন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
এই হাদিসের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। একজন শ্রমিক যখন ইট তোলে, মাটি কাটে, কিংবা রিকশার প্যাডেলে চাপ দেয়; তখন তার কাজ শুধু দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণ করে না; বরং যদি তার হালাল উপার্জনের নিয়ত থাকে তাহলে তা ইবাদতেও পরিণত হয়।
কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে আরেকটি প্রশ্ন তোলে; আমরা কি এই মর্যাদাকে স্বীকার করি? আমরা কি শ্রমজীবি মানুষদের সেই চোখে দেখি, যে চোখে ইসলাম দেখতে শিখিয়েছে?
একজন শ্রমিকের দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তা দিয়ে, আর শেষ হয় ক্লান্তির গভীর অন্ধকারে। তবুও সে থামে না। কারণ তার কাছে জীবন মানে দায়িত্ব। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়বদ্ধতা। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কেনার চাপ। এসব ছোট ছোট স্বপ্নইগুলোই তাকে চালিয়ে নেয়। অথচ এই মানুষটিকেই আমরা অনেক সময় অবহেলার দৃষ্টিতে দেখি, তার প্রাপ্য মজুরি দিতেও দেরি করি, কিংবা তার কষ্টকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।
এখানেই ইসলামের শিক্ষা আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন— ‘শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দাও’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩)
এটি শুধু একটি নৈতিক উপদেশ নয়; বরং এটি এক ধরনের জবাবদিহির ঘোষণা। একজন শ্রমিকের ঘামকে অবমূল্যায়ন করা মানে তার অধিকারকে অস্বীকার করা, আর সেই অধিকার আল্লাহর কাছেই নথিভুক্ত থাকে।
আরও গভীরে তাকালে দেখা যায়, ইসলামে শ্রমিক-নিয়োগকর্তার সম্পর্ক কেবল লেনদেনের নয়; এটি আমানতের সম্পর্ক। একজন শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে, জীবনের একটি অংশ দিয়ে আমাদের ওপর ভরসা রাখে। সেই ভরসা রক্ষা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানেরও অংশ।
পবিত্র কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সৎকর্মের নির্দেশ দেন…’ (সুরা নাহল আয়াত : ৯০)
এই ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও তার প্রাপ্য অধিকার পায়। তাই শ্রমিক দিবস কেবল একটি তারিখ নয়; এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার একটি উপলক্ষ।
যদি আমরা একটু ভাবি যে, ভোরে বের হওয়া সেই মানুষটি, যার হাতে কড়া পড়ে গেছে, যার চোখে ঘুম জমে থাকে, কিন্তু যার হৃদয়ে আছে সন্তানের হাসি দেখার স্বপ্ন; সে কি কেবল একজন শ্রমিক? নাকি সে আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি, যার উপর নিরাপদে দাঁড়িয়ে আছি আমরা সকলেই?
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের মর্যাদা যেমন তার পোশাকে নয়, তেমনি তার পদবিতেও নয়; বরং মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ হবে তার তাকওয়া ও পরিশ্রমে। তাই যে মানুষটি মাটির সঙ্গে লড়াই করে, ঘামের বিনিময়ে রুটি জোগাড় করে; তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য সম্মান আর মর্যাদা, যা হয়তো আমরা সাধারণ চোখে দেখি না, কিন্তু মহান আল্লাহ অবশ্যই দেখেন।
তাই এই শ্রমিক দিবসে আমাদের ভাবতে হবে যে, আমরা কি এসব শ্রমজীবি ভাইবোনদের সেই চোখে দেখতে শিখেছি, যেভাবে ইসলাম দেখতে বলে?
আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি, যা একজন শ্রমিকের ঘামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
হয়তো উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু এই প্রশ্নটির উত্তরই হতে পারে আমাদের পরিবর্তনের শুরু।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



