'ক্যামনে বছর কাটবো, এই চিন্তায় চোখোর পাটি আটে না'

ছবি: আগামীর সময়
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর হাওরসহ বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ বোরো জমি আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হু হু করে পানি ঢোকায় অর্ধশতাধিক হাওরের আধাপাকা ধান এখন পানির নিচে। কৃষি বিভাগের হিসাবে চার উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমি আক্রান্ত হলেও বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। বছরজুড়ে খাবারের সংস্থান আর ঋণের টাকা পরিশোধের চিন্তায় এখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।
সরেজমিনে সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ পচা ধানের স্তূপ। কৃষক সুরধন সূত্রধর তার ১৫ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার পর ছেলে সুমনকে নিয়ে গলা সমান পানিতে নেমে পচা ধান কেটে তুলছেন। বাড়িতে সেই ধান শুকাতে ব্যস্ত স্ত্রী সুবাশী সূত্রধর ও পুত্রবধূ গীতা রানী সরকার। পচা ধানের তীব্র দুর্গন্ধের মাঝেই সুবাশী সূত্রধর আকুতি ঝরিয়ে বললেন, কিতা কইতাম রে বাবা, সাত কের (বিঘা) জমি তলাই গেছে। ঘরো খাওন নাই। ক্যামনে বছর কাটবো, এই চিন্তায় চোখোর পাটি আটে না। তার ভাষ্য, এক লাখ টাকা খরচ করে চাষ করা জমির ধান এখন খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে, অথচ আবাদের জন্য নেওয়া ৬০ হাজার টাকা ঋণ এখনো মেটানো হয়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে সুবিদপুর ও উমেদনগরের রুবিনা সরকার, গোপেন্দ্র সরকার এবং মোহন মিয়াসহ শত শত কৃষকের খলায়। হাওরে এখন বেশি টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। জীবন ঝুঁকি নিয়ে কৃষকরা পানিতে নেমে ধান কাটছেন; পানির নিচে জোঁকের কামড়ে পা থেকে রক্ত ঝরছে অনেকেরই। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বানিয়াচং শাখার সভাপতি দেওয়ান শোয়েব রাজা জানান, তার ১০০ বিঘা বর্গা দেওয়া জমিও পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। কৃষকরা এখন বর্গা পরিশোধ করা তো দূরের কথা, আগামী বছর আবাদ করার পুঁজিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার উল্লেখ করেন, এ পর্যন্ত মোট জমির ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যে প্রায় ৪ শতাংশ জমি তলিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বর্তমানে মাঠে থাকা অবশিষ্ট ৪১ শতাংশ জমির পুরোটাই বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বানিয়াচংয়ের শতমুখা এলাকায় বাঁধ ভাঙার পর থেকে একের পর এক হাওর প্লাবিত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হাহাকার বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে না দাঁড়ালে হাওরপাড়ের মানুষের জন্য আগামী দিনগুলো আরও ভয়াবহ সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।



