ভারতে প্রকাশ্যে ‘বিজয় দিবস’ করছে তালেবান

ভারতের আফগান দূতাবাস। ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পাঁচ বছরপূর্তিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ‘বিজয় দিবস’ সংবর্ধনার আয়োজন করতে যাচ্ছে তালেবান প্রশাসন। আগামী সোমবার আফগান দূতাবাসে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন তালেবান নিযুক্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নূর আহমেদ নূর। কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তি, আফগানপ্রবাসী ও সংবাদমাধ্যমকর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অনুষ্ঠানে। ভারত তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ভারতীয় কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পতাকা ও অন্যান্য কূটনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক থাকবে নয়াদিল্লি। হিন্দুস্তান টাইমস।
তালেবান মূলত আফগানিস্তানের একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন।
‘তালেবান’ শব্দের অর্থ ‘শিক্ষার্থীরা’। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে আফগান গৃহযুদ্ধের মধ্যে
পাকিস্তানের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া আফগান যোদ্ধাদের একটি অংশকে কেন্দ্র করে
দক্ষিণ আফগানিস্তানে গোষ্ঠীটির উত্থান। ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে তারা ‘ইসলামিক আমিরাত
অব আফগানিস্তান’ প্রতিষ্ঠা করে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলার পর আল-কায়েদার নেতা
ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তানে
সামরিক অভিযান চালায়। সেই
অভিযানে তালেবান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
এরপর দুই দশক ধরে বিদ্রোহ চালিয়ে যায় গোষ্ঠীটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের মুখে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান আবার কাবুল দখল করে এবং দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। সে দিনটিকেই তারা ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে।
একসময় তালেবানের কড়া বিরোধী ভারত এখন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে। মানবিক সহায়তা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগকে ঘিরে দুই পক্ষের বৈঠক বেড়েছে। গত জানুয়ারিতে নূর আহমেদ নূর দিল্লির আফগান দূতাবাসের দায়িত্ব নেন; মুম্বাই ও হায়দরাবাদের কনস্যুলেটেও তালেবান নিযুক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
কাবুলে নিজেদের কূটনৈতিক ও কারিগরি উপস্থিতিও বাড়িয়েছে ভারত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আফগানিস্তানের জন্য ১৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে আগামী সোমবারের আয়োজন শুধু তালেবানের ক্ষমতা দখলের বার্ষিকী নয়; আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই নয়াদিল্লি ও কাবুলের দ্রুত বদলে যাওয়া সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময়ও ভারত আফগানিস্তানের পাশে ছিল।
নয়াদিল্লিতে তালেবান দূতের তৎপরতা বাড়ছে
আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে যাওয়ার পর ভারতে নিযুক্ত প্রথম তালেবান কর্মকর্তা নূর। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি ভারতে আসেন। এরপর তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তালেবানের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে নূর কাবুলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম রাজনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের অক্টোবরে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরকারী প্রতিনিধিদলের সদস্যও ছিলেন তিনি।তালেবানের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার হিসেবে মুত্তাকির ওই ভারত সফরটি ছিল প্রথম। তার সফরের সময়ই নয়াদিল্লি ভারতে তালেবানের কূটনীতিক নিয়োগের অনুমতি দেয়।
ভারতে তালেবানের আরও দুই কর্মকর্তা বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। ইকরামুদ্দিন কামিল মুম্বাই এবং হাবিবুর রহমান আফতাব হায়দরাবাদে আফগান কনস্যুলেটের দায়িত্বে রয়েছেন।
ভারত-তালেবান যোগাযোগ বাড়ছে
মুত্তাকির ভারত সফরের পর কাবুলে ভারতের ‘টেকনিক্যাল মিশন’-এর মর্যাদা বাড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস করার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি। সে সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এই সিদ্ধান্ত ‘আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ আরও গভীর করার ক্ষেত্রে ভারতের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।’
মুত্তাকির সফরের পর আরও তিনজন তালেবান নেতা বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে ভারত সফর করেছেন। তাদের মধ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বরে শিল্পমন্ত্রী নূরুদ্দিন আজিজি, একই বছরের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নূর জালাল জালালি এবং চলতি বছরের জুলাইয়ে কৃষিমন্ত্রী আতাউল্লাহ ওমারি ভারত সফর করেন।






