ভারতের তরুণরা অপরাজেয়, কণ্ঠ রোধের দিন শেষ
- দিল্লিতে চলমান ককরোচ আন্দোলনে এখন শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, যোগ দিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানি যাদবও অংশ নিয়েছেন এ আন্দোলনে। নজিরবিহীন সে গণ জমায়েতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন আগামীর সময়ে পাঠকদের উদ্দেশে...

যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে লেখক (মাঝে)
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং সোনম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে আন্দোলনটি বেগ পায় এ মাসের শুরুতে। এরপর সাধারণ মানুষের সাড়া ছিল অভূতপূর্ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ একটি মাত্র দাবিকে সামনে রেখে একত্রিত হয়েছেন—জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে কমরেড নেহা, কমরেড মনীশসহ আরও অনেকে রয়েছেন, অনির্দিষ্টকালের অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং ভারত সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল একটিই—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
ভারতে জরুরি অবস্থার সময়কার আন্দোলন এবং আন্না হাজারের আন্দোলনের পর দেশটি এবার ভিন্ন ধরনের এক গণআন্দোলনের সাক্ষী হচ্ছে। এটি কেবল আরেকটি বিক্ষোভ নয়; এটি একটি সর্বভারতীয় গণজাগরণে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ, জাতপাত, শ্রেণি, ধর্ম ও আঞ্চলিক বিভাজন অতিক্রম করে এই আন্দোলন মানুষকে এক কাতারে এনেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিধ্বনি হিসেবে একে যথার্থই বলা হচ্ছে ‘জেন-জি আন্দোলন’।
আন্দোলনের গতি যত বেড়েছে, সরকারের ওপর চাপও বেড়েছে তত। প্রতিদিনই যন্তর-মন্তরে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আন্দোলনের গতি থামেনি এক মুহূর্তের জন্যও।
এরপরই আন্দোলনে আসে বড় মোড়।
অভিযোগ রয়েছে, সরকার সোনম ওয়াংচুককে একটি হাসপাতালে জোরপূর্বক আটকে রেখেছে। তবে এর মাধ্যমেই বড় ধরনের ভুল করেছে সরকার। যে পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটিই উল্টো আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। নাগরিক সমাজ আরও দৃঢ় অবস্থান নেয়। অনেকের কাছে এই আটক ছিল সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের লঙ্ঘন। তরুণদের দমিয়ে দেওয়ার বদলে এই ঘটনা হাজারো নতুন মানুষকে আন্দোলনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা দিল্লির দিকে যাত্রা শুরু করেন। অচিরেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক স্লোগান ‘চলো দিল্লি’ আবারও ধ্বনিত হতে থাকে সারা দেশে।
২১ জুলাই হাজারো তরুণ-তরুণী ভারতের সংসদের দিকে পদযাত্রা করেন। মিছিল এগোতে থাকলে দিল্লি পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। কিন্তু তরুণদের সাহস ভাঙেনি।
দিল্লির রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে নানা স্লোগানে—‘ভারত মাতা কি জয়!’, ‘জয় ভীম!’,‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ!’
এসব শুধু স্লোগান ছিল না; এগুলো ছিল আশা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
সংসদের অধিবেশন চলাকালে অনেক বিক্ষোভকারীর মনে হয়েছে, সংসদের বাইরে রাজপথে গণতান্ত্রিক ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থেমে যায়নি। একই দৃঢ়তা এবং একই দাবিকে সামনে রেখে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে যন্তর-মন্তরে।
কেউ কেউ এই আন্দোলনের সঙ্গে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের তুলনা করছেন। কিন্তু তারা একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
ভারতের তরুণরা মহাত্মা গান্ধীর পথ—সত্যাগ্রহের পথ—বেছে নিয়েছেন। তারা ড. বি. আর. আম্বেদকর দেখানো সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করছেন। তাদের সংগ্রাম সহিংসতার নয়, শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের। তারা বিশৃঙ্খলা চান না; তারা জবাবদিহি চান। তারা সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করছেন না; বরং সংবিধান যে অধিকার দিয়েছে, সেটিই প্রয়োগ করছেন।
ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার গণতন্ত্রের শত্রু নয়। বরং সেটিই গণতন্ত্রের ভিত্তি।
ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়াত অটল বিহারী বাজপেয়ীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তিনি শুধু একজন সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নন, ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবেও স্মরণীয়। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে নির্ভীকভাবে প্রশ্ন করেছেন। তার সমালোচনা ছিল তীক্ষ্ণ, কিন্তু কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি তার দেশপ্রেম।
আজ আমরা সেই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যই বহন করছি। সহিংসতার মাধ্যমে নয়, অহিংসার মাধ্যমে। ঘৃণার মাধ্যমে নয়, ভালোবাসার মাধ্যমে। সংঘাতের মাধ্যমে নয়, সংলাপের মাধ্যমে।
কারণ সংলাপ ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।
তাই শিক্ষা, তরুণ প্রজন্ম এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সিজেপি ও সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে আলোচনায় বসে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ করতে চাই এমন একটি বার্তা দিয়ে, যা প্রতিটি গণতন্ত্রকামীর মনে রাখা উচিত— সরকার আসবে, সরকার যাবে। রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে, রাজনৈতিক দল হারিয়েও যাবে। কিন্তু গণতন্ত্রকে টিকে থাকব।
‘সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু এই গণতন্ত্রকে টিকে থাকতেই হবে চিরকাল।’
ভাষান্তর: আহসান হাবিব মারুফ





