দিল্লির ফ্লাইওভারের নিচে জীবন
চামড়া পোড়ানো গরম সহ্য করছে গৃহহীন পরিবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শাহিদা
ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে ইদানীং এক মস্ত বড় ও ভয়ানক তাপপ্রবাহ বয়ে চলেছে। দিনের বেলা থার্মোমিটারের পারদ সেখানে অনায়াসে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যাচ্ছে এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ৩২.৪ ডিগ্রির নিচে নামছেই না। মে মাসের এই মরুর মতো তপ্ত আবহাওয়া গত ১৪ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে পুরো শহরকে এক জ্বলন্ত চুল্লি বানিয়ে ছেড়েছে।
সরকারি লাল সতর্কবার্তা দেখে অবস্থাপন্ন মানুষ যখন ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোণায় আরাম করছে, ফুটপাতের প্রায় ৩ লাখ গৃহহীন মানুষ তখন খোলা আকাশের নিচে আক্ষরিক অর্থেই পুড়ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম জলবায়ুর কামড়ে রাস্তায় থাকা মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টের শিকার হয়, কারণ তাদের কপালে পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা ভালো চিকিৎসার মতো মৌলিক জিনিসগুলো একদমই জোটে না।
গত গ্রীষ্মের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৯ দিনের এক দাবদাহে দিল্লির রাস্তায় প্রায় ১৯২ জন অসহায় গৃহহীন মানুষ বেঘোরে মারা গেছে।
কুড়ি বছর বয়সী তরুণী শাহিদা নিজের জীবনের পুরোটা সময়ই এই দিল্লির এক ফ্লাইওভারের নিচে কাটিয়ে দিয়েছেন। ফুটপাতে সস্তা মশারির নিচে পুরো পরিবার নিয়ে ঘুমানো এই মেয়েটি প্রতিবছর গরমের দিন আসার কথা শুনলেই ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে যান। তবে এবারের গ্রীষ্মকালটি শাহিদার জীবনের এক মস্ত বড় ও কঠিন পরীক্ষা, কারণ তার কোলে এখন রয়েছে জান্নাত নামের এক ৯ মাসের একরত্তি দুগ্ধপোষ্য কন্যাসন্তান।
নিজের কষ্টের চেয়েও কোল ঘেঁষে থাকা অবুঝ শিশুর কোমল চামড়া এই গনগনে আগুন কীভাবে সহ্য করবে, তা ভেবেই শাহিদার বুকের ভেতর সারাক্ষণ দুরুদুরু কাঁপন চলে। জান্নাতের জন্মের ঠিক পরপরই তার স্বামী যখন তাকে একলা ফেলে চলে যান, তখন শাহিদা বাধ্য হয়ে এই ফ্লাইওভারের নিচে তার মা-বাবা ও বোন— ১০ জনের বিশাল সংসারে এসে মাথা গোঁজেন।
একসময় ফ্লাইওভারের উল্টো দিকের পার্কের এক ঝুপড়িতে তাদের সংসার থাকলেও পুলিশ প্রশাসন কয়েক বছর আগে সেটি গুঁড়িয়ে দেয়, যার ফলে এখন আর তারা নতুন ঘর বাঁধার কোনো বৃথা চেষ্টাই করেন না। ধুলোবালির এই ফ্লাইওভারের কংক্রিটের ছাদটি সরাসরি সূর্যের আলো থেকে কিছুটা ছায়া দিলেও দুপুরের দিকে এর তলার বাতাস এক দমবন্ধকর নরককুণ্ডে রূপ নেয়।
এই প্রচণ্ড গরমের দিনে দিল্লির গৃহহীন নারীদের জীবনের চাকা কীভাবে ঘুরছে, তা স্বচক্ষে দেখতে এক নামি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সকাল থেকেই শাহিদাকে গভীরভাবে অনুসরণ করছিল। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পাশের রাস্তা দিয়ে বড় বড় বাস-ট্রাক বিকট হর্ন বাজিয়ে যাওয়ার শব্দে ছোট্ট জান্নাত প্রথমে ধড়ফড় করে জেগে ওঠে। শাহিদা তার মশারির খাঁচাটি দ্রুত ভাঁজ করে ঘুমানোর পাতলা চাদরটি গুটিয়ে তার বোন আবিদার জিম্মায় বাচ্চাকে দিয়ে দিনের কাজ শুরু করেন।
প্লাস্টিকের বোতলের বাসি পানি মুখে ছিটিয়ে তিনি পাশের এক টং দোকান থেকে সবার জন্য সস্তা চা কিনে আনেন। ফুটপাতে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে শাহিদা জানালেন, এই খিটখিটে গরমে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বড্ড যন্ত্রণাদায়ক, আর ঠিকমতো না খাওয়ার কারণে তার নিজের বুকের দুধও শুকিয়ে আসছে। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পার্কের গণ-ট্যাপের পানি দুপুরের দিকে ফুটন্ত চায়ের মতো গরম হয়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার ২০ রুপি দিয়ে তাদের ঠান্ডা পানি কিনতে হয়।
দুপুরের দিকে ফুটপাতের পিচ আর কংক্রিট যখন চুলার মতো তাপ ছড়াতে শুরু করে, তখন শাহিদার পিঠে ও মুখে ঘামাচির লাল লাল র্যাশ বা চুলকানি এক ভয়ানক জ্বালা তৈরি করে। রাতের বেলা বখাটেদের ইভ টিজিং আর পুলিশের লাঠির ভয়ে নারীরা সারা রাত জেগে পাহারা দেওয়ার কারণে দিনের বেলা তাদের মাথা ঘোরা আর বমি বমি ভাব পিছু ছাড়ে না।
সব কষ্টের মাঝেও দুপুরের দিকে আলগা ইট দিয়ে তৈরি অস্থায়ী উনুনে কুড়িয়ে আনা কাঠ আর প্লাস্টিক পুড়িয়ে শাহিদার মা এক হাঁড়ি ভাত আর আলুর তরকারি রান্না করেন। এই একবেলার রান্না করা খাবারই তারা দুপুর এবং রাতের বেলা ভাগযোগ করে খেয়ে কোনোমতে পেট ভরান, আর যেদিন হাতে কোনো টাকা থাকে না, সেদিন উপোস থেকে কিংবা পথচারীদের দয়ার ওপর ভর করে তাদের দিন কাটাতে হয়।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই তপ্ত আবহাওয়ায় গৃহহীন নারীদের মনস্তাত্ত্বিক কষ্ট পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ ইদানীং চরম খিটখিটে মেজাজ আর মানসিক অবসাদে ভুগছেন। বিকাল ৪টার দিকে চারপাশের গাড়ির গরম ধোঁয়া যখন তাদের গায়ের ওপর এসে আছড়ে পড়ে, দুই বোন তখন ১০ রুপি খরচ করে প্রতিবেশীর দোকানে চার্জ দেওয়া ফোনে ইউটিউব ভিডিও দেখে কোনোমতে মন ভোলানোর চেষ্টা করেন। গরমে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে গত মাসেই শাহিদার এক বোন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বাচ্চাদের এমন চুপচাপ ও নিস্তেজ হয়ে বসে থাকা দেখে শাহিদার মনের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক ভর করে।
দিনের সব ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুই বোন আধ কিলোমিটার দূরের এক সুলভ শৌচাগারে ১০ রুপি খরচ করে গোসল করতে যান, কারণ দুপুরের দিকে গোসল করলে ধুলো আর ঘামে শরীর আবার সঙ্গে সঙ্গেই নোংরা হয়ে যায়। গোসল সেরে এসে শাহিদা জমানো পানি দিয়ে জান্নাতকে খুব আলতো করে ধুয়ে দেন এবং এক সরকারি অফিস থেকে পাওয়া ঠান্ডা পানি কনটেইনারে ভরে রাতের জন্য গুছিয়ে রাখেন।
দিল্লি শহরে গরিব মানুষের থাকার জন্য নাইট শেল্টার বা রাতের আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও প্লাস্টিকের তৈরি সেই কেবিনগুলোর ভেতরের গরম বাইরের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক। রাত ৯টার দিকে ভাতের থালা মুখে দিয়ে শাহিদা ফুটপাতে আবারও তার চেনা মশারির দুর্গটি গড়ে তোলেন।
মশারির ভেতর জান্নাত যখন আনমনে খেলা করে, শাহিদা তখন রাস্তার অন্তহীন হেডলাইটের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, প্রতিটি দিনই আসলে এক অদৃশ্য মৃত্যুর মুখ থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরার এক জীবন্ত সংগ্রাম।
















