পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি
লাভ জিহাদ-ল্যান্ড জিহাদ রুখতে কড়া আইন বিজেপির

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি অর্থাৎ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পাশাপাশি ‘লাভ জিহাদ’ এবং ‘ল্যান্ড জিহাদ’ বন্ধ করতে কড়া আইন আনার ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার আলিপুরের উত্তীর্ণ সভাঘরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রাক্তন আন্তর্জাতিক কার্যনির্বাহী সভাপতি অশোক সিঙ্ঘলের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একাধিক আইনি পদক্ষেপের কথা জানান তিনি। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর পশ্চিমবঙ্গেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর বক্তব্যে এদিন বারবার উঠে আসে হিন্দু ধর্ম, সনাতনী সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের প্রসঙ্গ। তার দাবি, বিজেপি সরকার সংবিধান মেনেই কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকে ভারতীয় সংস্কৃতি, সনাতনী ঐতিহ্য এবং সাধু সন্তদের অপমান কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অতীতে রাজ্যে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারের অভিযোগ তুলে পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও আক্রমণ শানান তিনি।
অশোক সিঙ্ঘলের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু আরও কয়েকটি সাম্প্রতিক ও অতীত ঘটনার উল্লেখ করেন। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এবং হরগোবিন্দ দাস হত্যার প্রসঙ্গের পাশাপাশি মোথাবাড়িতে হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট এবং ডালখোলায় রামনবমীর মিছিলে হামলার অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব ঘটনার উল্লেখ করে তার বক্তব্য, হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত বরদাস্ত করা হবে না।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও এদিন সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। যাদবপুরে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ শক্তি সক্রিয় থাকার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যারা ‘আজাদি’র স্লোগান দেয় কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করা হবে। পশ্চিমবঙ্গকে আরও ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি রাজ্যকে দেশের ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার
কথাও বলেন তিনি।
আগামী কয়েকমাসের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তার ঘোষণা অনুযায়ী, ১৭ নভেম্বর নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ২০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে হনুমান চালিশা পাঠ এবং ২৯ ডিসেম্বর ব্রিগেডে ২০ লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠের আয়োজন হবে। ১৬ থেকে ২৪ জানুয়ারি এক হাজার আটটি যজ্ঞ কুণ্ডের কর্মসূচির কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
লাভ জিহাদ কী?
‘লাভ জিহাদ’ বলতে সাধারণত এমন একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে বোঝানো হয় যেখানে দাবি করা হয়, মুসলিম পুরুষেরা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু মহিলাদের সঙ্গে প্রেম বা বিয়ে করে তাদের ধর্মান্তরিত করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড- সহ কয়েকটি রাজ্যে ধর্মান্তর- বিরোধী আইন হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, আইনের কিছু বিধান প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজের পছন্দে বিয়ে এবং ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকারকে পুলিশের নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসে। আন্তঃধর্মীয় দম্পতিদের হয়রানির আশঙ্কাতেও আদালতে এই আইনগুলির বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়।
ল্যান্ড জিহাদ কী?
‘ল্যান্ড জিহাদ’ বলতে সাধারণত মুসলিমরা পরিকল্পিতভাবে সরকারি বা অন্যের জমি দখল করছে, ধর্মীয় স্থাপনা তৈরি করছে বা জমি কিনে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে- এমন অভিযোগকে বোঝানো হয়। তবে এই শব্দেরও কোনও একক, সর্বভারতীয় আইনি সংজ্ঞা নেই। উত্তরাখণ্ডে এই অভিযোগ ঘিরে মসজিদ, মাজার বা মুসলিমদের জমি নিয়ে অভিযান ও বিতর্ক হয়েছে। কোথাও অবৈধ দখলের অভিযোগ উঠলেও, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদন্তে জমি বা স্থাপনা বৈধ বলেও উঠে এসেছে। ফলে অভিযোগের আড়ালে কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইউসিসি বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি
ইউসিসি বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হল এমন একটি সাধারণ দেওয়ানি আইনব্যবস্থা। যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্কের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। উত্তরাখণ্ড ইতিমধ্যে ইউসিসি চালু করেছে এবং গুজরাতও ২০২৬ সালে এ নিয়ে আইন এনেছে। সমর্থকদের দাবি, এতে সব নাগরিকের জন্য একই নিয়ম হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, ব্যক্তিগত আইন বদলের প্রক্রিয়ায় মুসলিম- সহ সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত রীতিনীতি বেশি চাপে পড়তে পারে।



