চীনের ঘরে পণ্যের পাহাড়, বাজারে চাহিদার অভাব
ভারতই কি বেজিংয়ের নতুন ভরসা?
- গালওয়ান সংঘর্ষের পরও ভারত-চীনের বাণিজ্য কমেনি, বরং বেড়েছে
- চীনে উৎপাদন বিপুল, কিন্তু দেশের বাজারে মানুষের খরচ কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা দুর্বল
- ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের ভারতীয় বাজার তাই বেজিংয়ের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

ভারত- চীন সীমান্তে দুই দেশ কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বাণিজ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
দিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনের আগে থেকেই জল্পনা ছিল, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কি ভারতে আসবেন? কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকের পর সেই জল্পনা আরও জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পৌঁছন শি। সাত বছর পর তার ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর তিক্ততার মধ্যেও কেন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে বেজিং?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর শুধু কূটনীতিতে নয়, চীনের অর্থনীতির ভিতরেও লুকিয়ে রয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত- চীন সীমান্তে দুই দেশ কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বাণিজ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫১.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫- ২৬ অর্থবর্ষে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১১২.১৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
ভারতের শিল্পক্ষেত্রও চীনের প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে ভারত চীন থেকে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদ্যুতিন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। স্মার্টফোন তৈরি, টেলিকম ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন পণ্য উৎপাদনে চীনা উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধশিল্পেও চীন থেকে বিপুল পরিমাণ সক্রিয় ওষুধ-উপাদান আমদানি করে ভারত।
অন্যদিকে ভারতীয় বাজার চীনের কাছেও বিরাট সুযোগ। ২০২৫ সালে ভারতে ১৫ কোটির বেশি স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ ফোন অথবা তার উপাদান চীন থেকে এসেছে। শাওমি, ভিভো ও ওপোর মতো চিনা সংস্থাগুলি এই বাজার থেকে বিপুল সুবিধা পেয়েছে। গাড়ির বাজারও বেজিংয়ের নজরে- ২০২৫ সালে ভারতে প্রায় ৪৫ লক্ষ গাড়ি বিক্রি হয়েছে।
চীনের সমস্যাটা কোথায়?
আমেরিকার শুল্কনীতি, ইরান- যুদ্ধের প্রভাব এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীনের ঘরোয়া অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। রফতানি নির্ভর চীনে পণ্যের উৎপাদন বিপুল হলেও দেশের মানুষের খরচ কম। ফলে পণ্য তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তা বিক্রির মতো অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
চীন ইতিমধ্যেই আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও বিমা সংস্থাকে শক্তিশালী করতে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার নগদ সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবাসন বাজারের পতন, অতিরিক্ত ফ্ল্যাট, মানুষের হাতে টাকার অভাব এবং চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা ভোগব্যয় কমিয়েছে। এমনকি চীনের প্রাক্তন জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের উপপ্রধান হে কেং দুই বছর আগে বলেছিলেন, দেশে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের থাকার মতো খালি বাড়ি রয়েছে।
মধ্যবিত্তের চিন্তা শুধু বাড়ির দাম নিয়ে নয়। পেনশন মিলবে কি না, সন্তান- নাতিদের চাকরি হবে কি না এসব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আগামী দশকে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সি প্রায় তিন কোটি মানুষ কর্মজীবন থেকে বেরিয়ে যাবেন। ২০১৯ সালে চীনের সামাজিক বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি অনুমান করেছিল, ২০৩৫ সালের মধ্যে সরকারি পেনশন তহবিল ফুরিয়ে যেতে পারে। ২০২৩ সালের সরকারি হিসাবে, শহরে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের প্রতি পাঁচজনে এক জনেরও বেশি বেকার ছিলেন। এরপর যুব বেকারত্বের তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দেয় সরকার।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অরবিন্দ ইয়েলেরির মতে, গালওয়ান-পরবর্তী সময়েও চীন ভারতের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করেনি। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাণিজ্য বরং বেড়েছে। চীন জানে, তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির বহু ব্যবসা ভারতের সঙ্গে যুক্ত এবং সেই ব্যবসা থেকে আসা অর্থ শেষ পর্যন্ত চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেই ফেরে। তাঁর মতে, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে দুই দেশের বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে।
২০২০ সালের পর চীনা বিনিয়োগে ভারতের কড়াকড়ি বাড়লেও তার আগে আলিবাবা ও টেনসেন্ট পেটিএম, জোম্যাটো, ওলা ইলেকট্রিক ও বাইজুর মতো ভারতীয় সংস্থায় বিপুল অর্থ ঢেলেছিল। পরে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে একাধিক চীনা বিনিয়োগ আটকে দেয় ভারত। চীনও বিরল মাটি, গাড়ি তৈরির প্রয়োজনীয় চুম্বকসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে সরবরাহ সীমিত করার চেষ্টা করেছিল।
তবু সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে। গত বছর দুই দেশের সরাসরি বিমান চলাচল ফের শুরু হয়েছে, চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভারত ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করেছে। যদিও আলিপে- কে ভারতের তাৎক্ষণিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব নিরাপত্তার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং শাওমির বিরুদ্ধে তদন্তের কথাও উঠেছে। ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও শিল্প- সরঞ্জাম না দিতে চীনা কর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। যদিও চীনের বাণিজ্য মন্ত্রক তা অস্বীকার করেছে।
অর্থাৎ সীমান্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও অর্থনীতির হিসাব আলাদা। চীনের ঘরে যখন পণ্যের পাহাড়, অথচ নিজের বাজারে চাহিদার অভাব, তখন ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দ্রুত বাড়তে থাকা ভারতের বাজার বেজিংয়ের কাছে ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই প্রয়োজনই হয়তোবা কূটনীতির দূরত্ব কমানোর অন্যতম একটি কারণ।



