ভারতের নির্বাচন কেন নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে

ভারতের নয়াদিল্লিতে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের মুখাবয়বের মুখোশ পরে ও হাতকড়া পরা অবস্থায় বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন যুব কংগ্রেসের এক কর্মী। ছবি : রয়টার্স
ভোটারের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা আস্থার জায়গায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। দেশটির নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের মতবিরোধ নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচন পরিচালনা করাই এর দায়িত্ব। গত কয়েক দশকে বিপুল জনসংখ্যার দেশে এত বড় ও জটিল নির্বাচন সফলভাবে আয়োজনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসা পেয়েছে।
কিন্তু এখন সেই প্রতিষ্ঠান নিয়েই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আনার সময় কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার তার দুই সহকমিশনারের উদ্বেগ বারবার উপেক্ষা করেছেন। ওই দুই কমিশনারও একই পদমর্যাদার।
নতুন এই তথ্য সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতের বিরোধী দলগুলো কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আসছে। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা পরিবর্তনের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কমিশনের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।
ভারতে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য, জাতপাত, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজন এবং নির্বাচনে অর্থের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে লড়ছে।
তবে এসব সমস্যার মধ্যেও নির্বাচনের মূল প্রক্রিয়াটি এত দিন তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও ভারতের নির্বাচন সাধারণত অবাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আস্থায় ফাটল দেখা দিয়েছে।
বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য। ভোট সঠিকভাবে গণনা হচ্ছে কি না, সেটিও প্রশ্নের মুখে। একই সঙ্গে ভোটার হওয়ার অধিকার নির্ধারণে নিয়ম মানা হচ্ছে, নাকি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থাকে আরও নড়বড়ে করেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে কুরেশি বলেছেন, ‘আজ সেই আস্থা নড়ে গেছে। দেশের জন্য এটি খুবই হতাশাজনক,’। তিনি ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান ছিলেন।
তার ভাষায়, একসময় নির্বাচন কমিশন ছিল অত্যন্ত সুনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান। এখন প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তাহলে এর অর্থ কী? ভারতের গণতন্ত্রের জন্য এর প্রভাব কতটা বড়?
নির্বাচন কমিশনের ভেতরে কী ঘটেছে
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্প্রতি একাধিক প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের তথ্য প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনে তিনজন কমিশনার রয়েছেন—জ্ঞানেশ কুমার, সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি। কুমার কমিশনের প্রধান।
ভারতের আইনে কমিশনকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সান্ধু ও যোশি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেগুলো কুমার এককভাবে নিয়েছেন বলে তারা মনে করেন।
গত বছরের জুন থেকে রাজ্যভিত্তিক ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ, সংখ্যালঘু এবং সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিরোধী দলগুলো বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত নিয়ে গেছে। আদালত ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটির বড় অংশ অনুমোদন করেছে।
ভারতের ১৪০ কোটির বেশি মানুষের জন্য ভোটাধিকার শুধু ভোট দেওয়ার বিষয় নয়। দেশটির বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক কর্মসূচির সঙ্গেও ভোটার পরিচয়ের বিষয়টি যুক্ত।
এ কারণে ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ পড়া তার নাগরিক জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কমিশনের ভেতর থেকেই এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি উঠেছিল।
গত ১০ মাসে সান্ধু ও যোশি অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, তাদের পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সান্ধু এমন পদক্ষেপকে ‘অনুমোদনহীন ও বেআইনি’ বলেছেন।
আপত্তিগুলোর মধ্যে ছিল নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল করা, নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে করা আপিল এবং ভোটার তালিকার নিরাপত্তা।
অর্থাৎ, কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল।
ভোটার তালিকা সংশোধন কেন এত বিতর্কিত
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর।
এর সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো, এতে একজন ভোটারকে নিজের ভোটাধিকার প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।
মানুষকে বহু পুরোনো জন্মনিবন্ধন, জমি ও শিক্ষাগত সনদের মতো নথি দেখাতে হচ্ছে। দরিদ্র মানুষ, অভিবাসী শ্রমিক এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এসব নথি সংগ্রহ করা কঠিন।
কয়েক দশক আগের নথিতে নামের বানান বা তথ্যের সামান্য অমিল থাকলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ফলে নির্বাচনের আগে দেশের ভোটারদের কাঠামোই বদলে যেতে পারে।
কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে মুসলিম ভোটারদের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে আলজাজিরার আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে ক্ষমতায় আসে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৩৪ শতাংশ মুসলিম ছিলেন। অথচ রাজ্যের মোট জনসংখ্যায় মুসলিমদের অংশ প্রায় ২৭ শতাংশ।
বিজেপি এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার সমর্থকেরা অবশ্য বলছেন, এর মূল লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসী, মৃত ব্যক্তি এবং ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বাদ পড়া অনেক মুসলিমকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ হিসেবেও চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, ভারতীয় নাগরিকদেরও এই প্রক্রিয়ায় সমস্যায় পড়ার প্রমাণ রয়েছে।
প্রক্রিয়াটি দেশের অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও তার স্ত্রীকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদেরও কেউ কেউ নোটিশ পেয়েছেন। তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।
এমনকি যারা বছরের পর বছর বিদেশে ভারতের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন, তাদেরও এই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে বিষয়টি এখন শুধু বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক আপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার, ভোটার যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং ভোটারদের ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মানদণ্ড নিয়েও দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভোটারকে কেন নিজের অধিকার প্রমাণ করতে হবে
ওয়াশিংটনভিত্তিক নির্দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মিলান বৈষ্ণব মনে করেন, এই পদ্ধতি ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দিচ্ছে।
তার মতে, ভারতের সংবিধান গ্রহণের পর থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নিশ্চিত করা যে সমাজের শেষ মানুষটিও ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে ভারতের পার্থক্য এখানেই। বৈষ্ণবের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকার পাওয়ার পথে বিভিন্ন সময় নানা বাধা তৈরি হয়েছে। বিপরীতে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।
কিন্তু বর্তমান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সেই নীতিই উল্টে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
এখন ভোটারকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে, ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার অধিকার রয়েছে।
এটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে ভোটাধিকার নিয়ে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ধরনও বদলে যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
সাবেক নির্বাচন কমিশনার কুরেশি বলেছেন, তিনি ভোটার তালিকা সংশোধনের অধীনে নেওয়া নীতিগুলোর বিরোধিতা করেছেন।
তার আশা, সাম্প্রতিক তথ্যগুলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হবে।
তিনি বলেছেন, ‘আমি আশা করি, এই তথ্যগুলো সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় সরকার ও সংসদসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় গুরুতর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তার মতে, নির্বাচন কমিশনের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তবে আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
বিরোধীরা কী চাইছে
কংগ্রেস নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরলে কমিশনের নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
অন্যদিকে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি জেন-জি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীও নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
জুলাইয়ে তাদের আন্দোলনের পর ভারতের শিক্ষামন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, আজ শনিবারের মধ্যে কুমার পদত্যাগ না করলে তারা আবার রাস্তায় নামবে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছে তারা।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।
এক বিবৃতিতে কমিশন বলেছে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে তিন কমিশনারের মধ্যে বিভিন্ন মত ও আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।
মোদির দল বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রও বলেছেন, কমিশনের ভেতরে আলোচনা বা মতপার্থক্য থাকাই বরং ‘সুস্থ গণতন্ত্রের’ লক্ষণ।
কিন্তু সমালোচকদের উদ্বেগ তাতে কমছে না।
কারণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি সরাসরি নাগরিকের ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করছে।
রাহুল গান্ধী বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করেছেন, ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা মৌলিকভাবেই ভেঙে পড়েছে।
তার ভাষায়, নির্বাচনের প্রতি মানুষের ‘পবিত্র বিশ্বাস’ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
গান্ধী সরাসরি মোদিকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নেতার জনপ্রিয়তা বোঝা সম্ভব। কিন্তু সরকারবিরোধী জনমত কেন ও কীভাবে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, সেটি বোঝা কঠিন।
তিনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তুলনা টেনে বলেছেন, এমন কোনো গণতন্ত্র নেই যেখানে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমত কাজ করে না।
তার বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত ২০১৯ ও ২০২৪ সালে মোদির পুনর্নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোদির ওই দুই নির্বাচনী বিজয়ে ব্যাপক ভোট কারচুপির মাধ্যমে বিজেপি সুবিধা পেয়েছে—এমন দৃঢ় প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ এবং প্রমাণিত নির্বাচনী অনিয়মকে এক করে দেখা যায় না।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন তথ্য সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতের গণতন্ত্রের জন্য এর অর্থ কী
নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফল প্রকাশ—পুরো প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা থাকা জরুরি।
ভারতের ক্ষেত্রে এই আস্থার জায়গাটিই এখন চাপের মুখে।
নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলি মনে করেন, ভারত একটি ‘বিপজ্জনক মুহূর্তে’ পৌঁছেছে। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
তার মতে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে গণতন্ত্রের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ।
আলির মতে, ভারতের রাজনীতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বন্ধু ও শত্রুর বিভাজন আরও তীব্র হচ্ছে।
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক রশীদ কিদওয়াইয়ের মতে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষতা।
তিনি বলেছেন, ভারতের ইতিহাসে কঠিন সময় এসেছে। এমনকি জরুরি অবস্থার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে এমন মাত্রায় প্রশ্ন আগে কখনো ওঠেনি।
তার যুক্তি, একটি খেলায় কে জিতল বা হারল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আম্পায়ার নিরপেক্ষ ছিলেন কি না।
এই জায়গাতেই বর্তমান বিতর্কের মূল গুরুত্ব।
নির্বাচনের বাইরে ভারতের গণতন্ত্র যেসব প্রশ্নের মুখে
কার্নেগির বৈষ্ণব মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে প্রধান সমালোচনাগুলো ছিল নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়কে ঘিরে।
সমালোচকেরা নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন, আইনের অসম প্রয়োগ এবং নির্বাহী বিভাগের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার কথা বলেছেন।
তবে নির্বাচন এলেই পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল।
বৈষ্ণবের মতে, অধিকাংশ পর্যবেক্ষক এত দিন মনে করতেন, নির্বাচনের সময় ভারতের গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ থাকে।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম সেই পার্থক্যকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এ কারণেই এবারের বিতর্ক শুধু একটি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নয়। প্রশ্নটি এখন আরও বড়।
ভারতে কে ভোট দিতে পারবেন, সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে? সেই সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ হবে? একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কি রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে পারবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নির্বাচনের ফল নিয়ে পরাজিত ও বিজয়ী দুই পক্ষই কি একই প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখতে পারবে?
একটি গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু ভোটের আয়োজন নয়। নির্বাচন হলো মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সেই পথের ওপর আস্থা নড়ে গেলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
ভারতে এখন সেই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে।
সূত্র : আলজাজিরা









