লাঠিচার্জ-টিয়ার গ্যাসে উত্তাল দিল্লি
আটকের পর মুক্ত ককরোচ নেতা অভিজিৎ, পদত্যাগ করতে পারেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও দাবি শিক্ষার্থিদের
- কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট বৈঠক আন্দোলনের দুই নেতার
- অনশন শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক
- গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে মিছিল

অভিজিৎ দীপকে- রয়টার্স
লোকসভার বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাজধানী দিল্লি কার্যত পরিণত হল বিক্ষোভ, অবরোধ এবং পুলিশি কড়াকড়ির কেন্দ্রবিন্দুতে। নীট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং আন্দোলনরত সোনম ওয়াংচুকের দাবির সমর্থনে ডাকা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকে আটক করে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। এরপরই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘাত, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং একাধিক বিক্ষোভকারীকে আটকের ঘটনা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজধানী। উত্তাল এই অবস্থার মধ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বিজেপির ‘চাণক্য বা মাষ্টারমাইন্ড’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এরপরই গুঞ্জন ওঠে , শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র। আটকের কয়েক ঘন্টা পরেই অবশ্য নেতাকর্মী সহ তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
সোমবার সকাল থেকেই জন্তর মন্তরে হাজার হাজার ছাত্র-যুব, চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষক, সামাজিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য ছিল সংসদের দিকে পদযাত্রা করে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু সংসদ চত্বরে পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড বসিয়ে পথ আটকে দেয় পুলিশ। পার্লামেন্ট স্ট্রিট, শাস্ত্রী ভবন এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আশপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরাতে বলপ্রয়োগ করে । এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয় যাতে আন্দোলনকারীরা আসতে না পারেন।
আন্দোলনের দুই নেতা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্সে জানান, তারা একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। নাড্ডা বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
নীটসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও দাবি করছেন। একই সঙ্গে পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক সোমবার তার অনশন শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু তাদের কথা শোনার বদলে প্রশাসন শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস দাবি করেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব ভাঙতেই অভিজিৎ দিপকেকে আটক করা হয়েছে। তার অভিযোগ, আলোচনার বদলে আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা চলছে।
প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর বিবক্ষোভে সামালে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল দিল্লি প্রশাসন। পার্লামেন্টের আশপাশে ৫ জনের বেশি জমায়েত নিষিদ্ধ করেছিল।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন করা হয়। পুলিশ নিষেধাজ্ঞা থোরাই কেয়ার করে ঢুকে পড়ে সংসদ চত্বরে। তারপরই শুরু হয় লাঠিচাজং, কাঁদানে গ্যাস।
নিরাপত্তার অজুহাতে রাজীব চক, প্যাটেল চক-সহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনের একাধিক প্রবেশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অফিসযাত্রী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। বহু যাত্রীকে স্টেশনের বাইরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লির বাইরেও দেশজুড়ে সাড়া পড়ে। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে সংহতি মিছিল ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আহমেদাবাদে অনুমতি না থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান।
সোমবার জন্তর মন্তরে পৌঁছান আম আদমি পার্টির প্রাক্তন মন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া, সঞ্জয় সিং ও আতিশীর মতো নেতারা। বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা দাবি করেন, ছাত্রদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আলোচনায় বসার পরিবর্তে কেন্দ্র সরকার পুলিশি কড়াকড়ির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে। রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গেও বিষয়টি উত্থাপন করে অভিযোগ করেন, ছাত্রদের কণ্ঠস্বর রুখে দিতে বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক গত ২১ দিন ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে চিকিৎসাধীন। তাঁর সমর্থনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা ও সমাজকর্মীও সরব হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনভর #SansadChalo এবং #StandWithStudents হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করে।
তবে চাপ বাড়তেই কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগের ইঙ্গিতও মিলেছে। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও সেই বৈঠকের বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু এখনও সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট আশ্বাস মেলেনি।




